রাজধানীর চকবাজারের কেমিক্যাল গোডাউনের ভয়াল আগুনের লেলিহান শিখার শোক কাটতে না কাটতে আবারও বড় ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এবার রাজধানীর অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকা হিসাবে পরিচিত বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ঘটল ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড। বনানীর ২২ তলা এফআর (ফারুক-রূপায়ন) টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ ১৯ জন নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আরো অন্তত ৭০ জনকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে একটার দিকে এ আগুন লাগে। আগুন থেকে বাঁচার আকুতি দেশবাসী লাইভ দেখেছে। একদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল, অন্যদিকে কেউ কেউ বাঁচার আশায় ভবনের কাঁচ ভেঙে সাত-আট তলা থেকে লাফিয়ে পড়ছিল। ভবনের আশেপাশে জড়ো হয়েছিল অর্ধলক্ষ জনতা। আটকে পড়া মানুষের অসহায়ত্ব তাদেরও গ্রাস করেছিল। যারা লাফিয়ে পড়েছিল প্রচণ্ড চিত্কারসহ পাকা সড়কে তাদের থেঁতলে যাওয়ার শব্দ, ক্ষতবিক্ষত দেহের বীভত্স দৃশ্য উপস্থিত লোকজনকে স্মৃতিতে অনেকদিন থাকবে।
প্রায় ৫ ঘণ্টা প্রাণান্তকর চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাত পর্যন্ত ৩৬ জন নিখোঁজ ছিল বলে ঘটনাস্থলে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে। তবে সন্ধ্যার পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ১৩ জনের লাশ এই নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে। আগুনের ঘটনা তদন্ত করতে ফায়ার সার্ভিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পূর্ত মন্ত্রণালয় পৃথক চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের দক্ষিণ পাশের বহুতল ভবনগুলো একটির সঙ্গে অপরটি গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। ৩২ নম্বর হোল্ডিংয়ে এফআর টাওয়ারের প্রায় প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে অফিস। রাজউক এই ভবনটির ১৬ তলা পর্যন্ত অনুমতি দিয়েছিল। অনুমতি ছাড়াই ভবনটি রাতারাতি ২২ তলা করা হয়। ভবনে রয়েছে তিনটি লিফট। সিঁড়ি রয়েছে দুইটি। একটি ২ ফুট ও অপরটি ৪ ফুট প্রশস্ত। বেসমেন্টে পার্কিং আছে। গতকাল কর্মদিবস হওয়ায় অফিসে কর্মীরা যথারীতি কাজ করছিলেন।
ভবনটির মালিক এএমএইচআই ফারুক। তিনি বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার। রূপায়ন গ্রুপকে দিয়ে তিনি ভবনটি তৈরি করান। ফারুকের সাবেক একজন পিএস ইত্তেফাককে বলেন, সপ্তম তলায় একটি বায়িং হাউজের কর্পোরেট অফিস রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই আগুন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ১১ তলা পর্যন্ত ৫টি ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে অষ্টম ও নবম তলায় রয়েছে দু’টি রেস্টুরেন্ট। এর একটি চাইনিজ ও অপরটি কোরিয়ান। এই দু’টি রেস্টুরেন্টের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে তার ধারণা।
ভবনটির সিকিউরিটি গার্ড মো. হালিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আগুন লেগেছে আসলে সোয়া ১২টার দিকে। ফায়ার সার্ভিস এসেছে পৌনে একটার দিকে। এ কারণে সবাই বলছেন, আগুন পৌনে একটায় লেগেছে। আসলে সাড়ে ১২টার দিকেই আমি কয়েকজনকে উপর থেকে লাফিয়ে পড়তে দেখি। তাদের অনেকেরই রাস্তায় পড়ে মাথার ঘিলু পর্যন্ত বের হয়ে গেছে। পরে এদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরা বেঁচে আছে না মারা গেছে, সে ব্যাপারে আমি বলতে পারব না। তবে কয়েকজনকে আমি যেভাবে দেখেছি তাতে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা কম।’
বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার দিকে ফায়ার সার্ভিস সূত্র ২৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। পরে রাত ১২ টার দিকে জানানো হয়, নিহতের সংখ্যা ১৯ জন। সন্ধ্যার পর থেকে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স এসোসিয়েশন থেকে ২৪০ টি অ্যাম্বুলেন্স আনা হয়। উদ্ধার তত্পরতায় সাধারণ মানুষেরাও অংশ নেন।
ইউনাইটেড হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার জানান, সেখানে যে তিনজনের মৃতদেহ রয়েছে, তাদের সবাই পুরুষ, তাদের একজনের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে, বাকিদের অন্য ইনজুরি ছিল। ওই হাসপাতালে মৃতদেহ রয়েছে—আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাকসুদ ও মনিরের। মামুন হ্যারিটেড এয়ারলাইন্সের চিফ একাউন্টন্স অফিসার ছিলেন। তার বাড়ি দিনাজপুর। বাকি দু’জনের নাম ছাড়া আর কিছু জানা যায়নি। গুলশানের অ্যাপলো হাসপাতালে আমিনা ইয়াসমিন নামে একজনের মৃতদেহ রয়েছে বলে জানান ভাটারা থানার ওসি কামরুজ্জামান। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকালের দিকে আরো একটি মৃতদেহ ঘটনাস্থল থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে তা জানা যায়নি। কুর্মিটোলা হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিকুননবী জানান, নিহত শ্রীলঙ্কান নাগরিক নিরস চন্দ্র ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন। বনানী ক্লিনিকে একজন মারা গেছেন। তার নাম পারভেজ সাজ্জাদ। তিনি লাফিয়ে পড়ে মারা যান।
শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান জানান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে একজনের লাশ রয়েছে। তার নাম আব্দুলাহ আল ফারুক (৩২)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভিনিংয়ে এমবিএ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ছেলে ফারুকের বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডটি পাওয়া গেছে তার পকেটে। আগুনে তার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। এছাড়া নিহত অন্যদের মৃতদেহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আবু হোসেন (৩৫), সাব্বির আলী মৃধা (২৫), রেজোয়ান আহমেদ (৩৭) ও শ্রীলংকান নাগরিক সিরি ইন্দ্রিকা (৪৬) ুশরীরে জখম ও আঘাত নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তারা সবাই ওই ভবনের বিভিন্ন অফিসে কাজ করতেন।
আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম খান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত পাঁচজনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এখানে কারো কোনো গাফিলতি নেই। উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে ধোঁয়ায় ফায়ার সার্ভিসের ৩ জন কর্মী অসুস্থ হয়ে গেছে। এছাড়া টেবিল টার্ণ লেডার দিয়ে উদ্ধার কাজ চালানোর সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একজন উদ্ধার কর্মীর এক পা থেঁতলে গিয়েছে। ভবনটিতে অনুসন্ধান শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলবে।
ভবনের একটি অফিসের কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, সপ্তম ও অষ্টম তলায় আগুন লেগেছে বলে মনে হয়। পরে এটা নবম তলায় গিয়ে পৌঁছে। এফ আর টাওয়ারের প্রায় সবকটি তলাতেই কোনো না কোনো অফিস এবং নিচের দুটি তলায় দোকান আছে। যে কোনো কর্মদিবসে অন্তত হাজারখানেক লোক এই ভবনে থাকেন।
সপ্তম ও অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর যখন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছিল উপরে, তখন প্রাণ বাঁচাতে উপরের বিভিন্ন তলা থেকে বেশ কয়েকজনকে লাফিয়ে পড়েন। কেউ কেউ তার বেয়ে নামতে গিয়েও নিচে পড়েন। আগুন লাগার পর ভবনের উপরের তলাগুলোতে আটকা পড়েন অনেকে, কাচ ভেঙে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কাছে প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানাতে দেখা গেছে তাদের। এদের অনেককে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কর্মীরা মই দিয়ে উদ্ধার করেন।
আইএসপিআরের পরিচালক লে. কর্নেল আব্দুলাহ ইবনে জায়েদ জানান, বনানীর আগুন নেভাতে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার কাজ করে। পাশাপাশি সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেন।
বেলা ৩ টার দিকে সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার অভিযান চালায়। এফআর ভবনের পূর্ব পাশের দেয়াল সংলগ্ন আউয়াল সেন্টারের ছাদে অনেকেই আশ্রয় নেন। ওই ভবনের ছাদ থেকে হেলিকপ্টার থেকে রশি নামিয়ে দিয়ে কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া হেলিকপ্টার থেকে পানিও ছিটানো হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মী আকরাম হোসেন বলেন, ভবনের অষ্টম তলা থেকে একটি মেয়ে তাকে ধরে ধরে নামার চেষ্টা করছিলেন। তখন হাত ফসকে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপর আরও দুইজন পুরুষ পড়ে যান।
এফআর টাওয়ারে প্রচুর দাহ্য পদার্থ রয়েছে জানান ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ডিডি) দেবাশীষ বর্ধন। ঘটনাস্থলে তিনি বলেন, এ ভবনে প্রচুর দাহ্য পদার্থ রয়েছে। ভবনের ভেতরে ডেকোরেশনগুলো বেশিরভাগই ফোম ও সিনথেটিক ফাইবার উপাদানের, যে কারণে খুব ধোঁয়া হয়েছে। এর ফলে কাজ করতে বেগ পেতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করেছি। আমাদের ২৫টি ইউনিট কাজ করেছে।
অগ্নিকান্ডের পর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে অন্তত অর্ধ লাখ মানুষের ঢল নামে। উত্সুক জনতার কারণে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযানে কিছুটা বিঘ্ন হয়। প্রথম পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি টেবিল টার্ন লেডার দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় জনতা উত্তেজিত হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, একটি লেডার দিয়ে পানি ছিটানোর সময় আবার আটকে পড়া মানুষকেও উদ্ধার করা হচ্ছিল। এ কারণে অনেকেই ফায়ার সার্ভিসের ওপর উত্তেজিত হয়ে যায়। পরে আরো দুইটি টেবিল টার্ণ লেডার এবং স্নোরিক্যাল ঘটনাস্থলে এনে উদ্ধার কাজ চালানো হয়।
উদ্ধার কাজ তদারকি করতে ঘটনাস্থলে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। রাত ১১ টার দিকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, এফআর টাওয়ারের আগুন এবং বিল্ডিং কোড মেনে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। যদি কারো গাফিলতি পাওয়া যায় তাহলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে এই ভবনে আগুন লাগার পর বেসরকারি দুরন্ত টেলিভিশন ও এফএম রেডিও টুডে’র সমপ্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই দুটি সমপ্রচার মাধ্যমের কার্যালয় এফআর ভবনের পাশেই অবস্থিত।
লাশের হিসাবে গরমিল :অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়। আশেপাশের উত্সুক জনতার মাঝে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ফায়ার সার্ভিস মৃতের সংখ্যা কম করে ঘোষণা দিচ্ছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার পর থেকে ভবনের সপ্তম তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত তিনটি ফ্লোর থেকে লাশ উদ্ধার শুরু হয়। রাত সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত ১৩ টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে ফায়ার সার্ভিস জানায়, মোট ১৯ টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এরই মধ্যে রাত ১১ টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের নোটিস বোর্ডে উল্লেখ করা হয় যে, মোট ২৫ জন নিহত হয়েছেন। পরে রাত ১২ টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃতের সংখ্যা ১৯ বলা হয়। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে ৬ টি লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর কারণে লাশের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। পূর্বের ১৯ টি লাশের সঙ্গে ৬ টি লাশ যোগ করে ২৫ জন নিহত বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে লাশের সংখ্যা হবে ১৯।