ওদের জন্য নেই বই উত্সব

৬ বছরের ওসমান যখন কাজে আসে তখন রাত ২টা, পৌষ মাসের মাঝামাঝি সময়। তখন একটু একটু ঠান্ডা লাগে তার। তারপর ইটের ভাটায় শুকনো ইট জড়ো করে পোড়াতে দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করার সময় ঠান্ডা চলে যায় তার। তাই গরম কাপড় পরা হয় না। যে সময়টায় আর দশটা শিশুর কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকার কথা, ঠিক সেই সময়টাই রাতের আঁধার আর শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে ইটের ভাটায় একদল মানুষ কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ মৌল্লাবাজার, আলুকান্দা ও বক্তার চর এলাকার মোল্লা সাহেবের ইটের ভাটা, আবু তালেব আর মক্কা-মদিনা ব্রিকস্ প্রভৃতি ভাটায় পুরুষের পাশাপাশি এই দলে নারী আর শিশুও যোগ দেয় বেঁচে থাকার সংগ্রামে শরিক হতে। জানুয়ারি মাসে নতুন বই আর নতুন ক্লাসের আনন্দ স্পর্শ করে না ৬ বছরের ওসমান, ১৩ বছরের আল-আমিন, ১১ বছরের জাহিদসহ শত শিশুকে। এই বছর বই উত্সবে ৩৬ কোটি ২১ লাখ বই বিতরণ করা হলেও ওদের জন্য আসেনি একটিও।

 
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বলছেন, সরকারের হিসাব মতে এখন ২০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে থাকছে তারা ভাসমান শিশু। তাদের জন্য প্রয়োজন উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম। আর সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক হলেও রাতারাতি লাখ লাখ ভাসমান শিশুকে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব নয়।
 
শুকাতে দেওয়া ইট উল্টানোর কাজ করে ওসমান (৬) সোহাগ (সাড়ে ৬ বছর)। এই কাজ করে তাদের আয় হয় সপ্তাহে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা। আল-আমিনের বয়স ১৩ আর জাহিদের ১১। তারা দুই ভাই। বাবার সাথে কাদের মোল্লার ইটের ভাটায় কাজ করতে আসে। তৈরি করা মাটি আনা, কাঠের ছাঁচে মাটি দিয়ে ইট বানানো আবার কখনো কখনো শুকনো ইট উল্টানোই তাদের কাজ। এই কাজ করতে তাদের কেমন লাগে প্রশ্ন করলে দুই ভাই হাসে কোনো উত্তর দেয় না। উত্তর দেন তাদের বাবা লাল মিয়া। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। জানান আগে কৃষিকাজ করতেন এখন টাকার অভাবে আর করতে পারেন না। তাই দুই ছেলেকে নিয়ে ইটের ভাটায় কাজে আসেন। নিজে কাজ করেন আট/দশ বছর। ছেলেদের এনেছের দুই বছর হলো। তাদের পড়াশুনা করান না প্রশ্ন করলে বলেন, বড় ছেলেটা আগে মাদ্রাসায় যেত। তারপর বলেন, অভাবের সংসার নিজের জন্য ২০ হাজার আর দুই ছেলের জন্য ২০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে কাজে এসেছেন। সপ্তাহে তার ৮শ আর দুই ছেলের ৬শ টাকা আয় হয়।
 
আবু তালেব মিয়ার ভাটায় নার্গিস আক্তার ৮ বছরের বাকপ্রতিবন্ধী ছেলেকে সাথে নিয়ে ইটের কারিগরের যোগালির কাজ করে। ছেলে সপ্তাহে ২শ/ আড়াই শ আর নার্গিস ৮শ টাকা পান। ভোর রাত থেকে সকাল ৯টা, ১০টা পর্যন্ত কাজ চলে। তারপর দুই ঘণ্টা ছুটি খাওয়া আর গোসলের। আবার কাজ শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সপ্তাহে একদিন ছুটি, সেই দিনও ভোরবেলাটা কাজ করতে হয়।
 
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকার বক্তার চরের উভয় পাড়ে বেশ কিছু ইট ভাটা ঘুরে দেখা গেল শিশুরা ছোটখাট রোগে ডাক্তার দেখায় না। কারো কারো স্কুলে না যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও কেউ কেউ মনে করেন স্কুলে পড়া তাদের জন্য নয়।
 
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল মোল্লা জানান, প্রতিটি ইটের ভাটাতে শিশু তাদের বাবা-মার সাথে আসে। একবারে ছোট যারা তারা এখানেই ঘোরাফেরা আর খেলাধুলা করে। পাঁচ/ছয় বছর হলে তারা প্রথমে ইট উল্টানোর মধ্যদিয়ে কাজে ঢুকে যায়। কেউ কেউ বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে। কেউ আবার নতুন করে কাজে ঢোকে। সমসের মিয়া এই ভাটা ঐভাটা করে ২০ বছর ইটের ভাটায় কাজ করেছেন। তিনি বলেন, শিশুরা কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইটের ভাটাতে আসে আর বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে চৈত্র-বৈশাখ মাসে চলে যায়। ইটভাটাতে পড়ার সুযোগ নেই। সরকারের প্রাথমিক বিদ্যালয় অনেক দূরে। ওরা যায় না। ব্র্যাকের একটি স্কুল আছে সেখানে স্থানীয়দের ছেলে-মেয়েরা পড়তে গেলেও এই শিশুরা যায় না। এই ভাটার ম্যানেজার লেহাজ উদ্দিন জানান, মাটি আনা থেকে শুরু করে পাকা ইট করতে ১৫ থেকে ১৮টি কাজ আছে। এর মধ্যে শিশুরা বয়স ভেদে তিন/চারটি যেমন- ইট ওল্টানো, মাটি তৈরিতে সহযোগিতা, মাটি টানা, পোড়া ইট আনা প্রভৃতি কাজ করে। বাবা-মার সাথে এসে সরদারের মাধ্যমে ওরা কাজ করে।
 
ইটের ভাটায় কোনো শিশু শ্রমিক নেওয়া হয় না উল্লেখ করে ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, দেশে ৬ হাজারেরও অধিক ইটের ভাটা আছে। ইটভাটা শিল্পের আওতায় নয় বলে আমরা অনেক সুবিধাবঞ্চিত। তার ওপর কাঠকয়লার দাম বেশি, কারিগরদের লাখ টাকা দাদন দিয়ে কাজ করাতে হয়। ফলে আমাদের শ্রমিকদের শিশুদের জন্য তেমন কিছু করার থাকে না। তবে কেউ করলে পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।
 
ব্র্যাক শিক্ষাকর্মসূচি পরিচালক ড. শামসুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, যেখানে সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম নেই সেখানেই ব্র্যাক কাজ করে। তাদের আসন সংখ্যা ৩০। চার বছরের প্রাথমিক শিক্ষা ভাসমান শিশুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ করতে পারে না।
 
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় দেখা যায়, এখনো ২০ শতাংশ ভাসমান শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় আনা সম্ভব হয়নি। কেরানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাজেদা সুলতানা ইত্তেফাককে বলেন, এলাকাটি কিছুটা সিরাজদি খান, কিছুটা নারায়ণগঞ্জ ও বাকিটা কেরানিগঞ্জের মধ্যে। তিনি বলেন, সরকার শতভাগ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তরিক। তবে লাখ লাখ ভাসমান শিশুকে রাতারাতি উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষা ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় উপ-পরিচালক ইন্দু ভূষণ দেব ইত্তেফাককে বলেন, আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছি। এই ভাসমান শিশুদের জন্য সরকারের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম আছে।

ইত্তেফাক/এএন