মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি ও গণফোরাম পৃথক কিংবা যৌথভাবে এই চিঠি দেবে। চিঠির খসড়া ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। গণফোরামের পক্ষ থেকে চিঠির একটি কপি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছেও পাঠানো হয়েছে। ফখরুল সেটি দেখে তার মতামতও জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে। সুলতান মনসুর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ধানের শীষ’ মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। দল-জোটের বারণ উপেক্ষা করে গত ৭ মার্চ তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে ওইদিনই সংসদের অধিবেশনে যোগ দেন।
গণফোরামের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, যেহেতু সুলতান মনসুর গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করেছেন সেই কারণে গণফোরাম তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল চেয়ে স্পিকারকে চিঠি দেবে। আর দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এ নির্বাচন করেও বিএনপির অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ায় সেটিকে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করবে বিএনপি। তবে গণফোরাম ও বিএনপি পৃথক চিঠি দেবে, নাকি যৌথ চিঠি দেবে সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গণফোরাম নেতারা জানান, সংবিধান অনুযায়ী প্রথমে স্পিকারের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে, আবেদন নিষ্পত্তির জন্য স্পিকার সেটি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন।
গণফোরাম সূত্রে জানা গেছে, সুলতান মনসুরের এমপি পদ কেন বাতিল করতে হবে, সেটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে খসড়া চিঠিতে। ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে, চিঠিতে তাদের প্রত্যেকের উদাহরণ ও বাতিলের কারণও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ মার্চ শপথ নেওয়ার আগে সুলতান মনসুর ইত্তেফাককে বলেছিলেন, ‘আমি গণফোরামের কেউ নই, আমি গণফোরামকে প্রতিনিধিত্বও করি না। কাজেই আমি শপথ নিলে গণফোরামের কে কি বললেন সেটি ভাবার দরকার আমার নেই’। এ ব্যাপারে ড. কামাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। উনি তো গণফোরামের মনোনয়নেই এমপি হয়েছেন। তাছাড়া তিনি গণফোরামের সদস্য ছিলেন। সদস্যফরম পূরণ করেই তিনি দলের সদস্য হয়েছিলেন। শপথ নেওয়ার কারণে পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ জানা গেছে, সুলতান মনসুর যে গণফোরামের সদস্য হিসেবে নির্বাচন করেছেন, চিঠিতে সেটির সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথিও সংযুক্ত করবে গণফোরাম।
প্রসঙ্গত, কারও সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে যদি তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথগ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন। তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’ এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।’
দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এমপি হিসেবে শপথ নিতে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। কেউ দল-জোটের অবস্থানের বাইরে গিয়ে এমপি হিসেবে শপথ নিলে তার সদস্যপদ শূন্য হবে কি-না, এ ব্যাপারে অবশ্য সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অতীতে বিএনপি দলীয় দুইজন সংসদ সদস্য তত্কালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগে যোগদান করায় পরবর্তীতে তাদের এমপি পদ শূন্য হয়েছিল। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। নবম সংসদে সাতক্ষীরা-৪ আসনে এমপি ছিলেন এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা এইচএম গোলাম রেজা। এমপি থাকাকালেই দল তাকে বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদ শূন্য হয়নি। অবশ্য জাপা তখন এব্যাপারে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এ ব্যাপারে তত্কালীন স্পিকারকে এবং নির্বাচন কমিশনেও কোনো লিখিত আপত্তি জানায়নি জাপা। এছাড়া দশম সংসদে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করায় তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়েছিল।