প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একজন সংসদ সদস্যকে হত্যা কখনো মেনে নেওয়া যায় না। গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডে যারাই জড়িত যেভাবেই হোক খুঁজে বের করে বিচারের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইতিমধ্যেই তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছি। গতকাল বুধবার সকালে গণভবন থেকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রংপুর বিভাগের আট জেলার জনগণের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও গাইবান্ধা জেলার জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
শিক্ষক, অভিভাবক, মসজিদের ইমামসহ সকল শ্রেণি-পেশার জনগণকে জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বস্তরের জনগণের কাছে আমার একটাই আহ্বান থাকবে- বাংলার মাটিতে এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান যেন না হয়। জাঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। কারণ জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস কখনো মানুষের জীবনে শান্তি বয়ে আনে না। বাংলার মাটিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে স্থান না দেওয়ার জন্য সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানই অন্যতম লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের কাছে লিটন, গাইবান্ধায় পুলিশ হত্যাসহ বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর আসামি গ্রেফতার এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান। প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালের মামলা ও দ্রুতবিচার আইনে মামলায় অদ্যাবধি অপরাধীদের সাজা না হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি দ্রুত এই সকল মামলার চার্জশিট প্রদান এবং আসামিদের গ্রেফতারে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তত্পর হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ২০১৩ সালের ঘটনা এখনো এই পর্যন্ত? তাহলে আর দ্রুত বিচারের কী হচ্ছে! বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে তো আমার একজন এমপিকে হত্যা করল। এরপরে আর কত ঘটনা ঘটবে কে জানে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগেরই দেড়শর বেশি নেতা-কর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে, তাদের দোকান-পাট ব্যবসা-বাণিজ্য সব লুটপাট হয়েছে.।
২১ বছর পর জনগণের যন্ত্রণা দূর হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর এ দেশের মানুষ এ যন্ত্রণা ভোগ করেছে। যে লক্ষ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করা হয়েছিলো তা বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আমাদের মেয়েদের তুলে দিয়েছে- হত্যায় সহযোগিতা করেছে, তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে বিএনপি। আমরা যেনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারি সেটাই লক্ষ্য ছিলো। ২১ বছর পর আমরা ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন ভাতা চালু করেছি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছি। চিকিত্সা সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করি; কিন্তু বিএনপি ফের ক্ষমতায় এসে সব বন্ধ করে দেয়।
এর আগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হয়ে ‘ড. ওয়াজেদ ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ ভবন (দশ তলা) এবং ১০০০ আসনের ‘শেখ হাসিনা ছাত্রী হল’-এর (দশ তলা) ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস থেকে আমাদের শিক্ষার্থী সমাজকে মুক্ত রাখার জন্য সচেষ্ট হওয়ার জন্য শিক্ষক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রংপুর বিভাগে আমরা দেখেছি ২০১৩ সালে যে তাণ্ডব হয়েছে- মানুষ হত্যা করা, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা, গাছপালা কেটে ফেলা। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট তারাই আবার জঙ্গির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বাসে, ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। পুলিশ হত্যা করেছে। আর সেইসাথে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলামে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নাই। আর কে ভাল কে মন্দ- সে বিচার করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলটি যখন ‘একনেক’-এ আসে এটি ছিল ৬শ আসন বিশিষ্ট। যেটি আমি এক হাজার আসন বিশিষ্ট করে দেই। কারণ আমরা আশা করি, আমাদের ছাত্রীসংখ্যা আরো বাড়বে। সেই সাথে সাথে আমরা বিজ্ঞানের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেই, আর গবেষণাটা একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষার মানোন্নয়নে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। যে কারণে আমরা এই গবেষণা ইনস্টিটিউট (ড. ওয়াজেদ) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। এই ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্স ইনস্টিটিউট আমাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। তিনি দীর্ঘকাল এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সংগ্রাম করেছেন। শোষিত-বঞ্চিত গৃহহীন মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে বারবার কারা নির্যাতন সহ্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার প্রসারে তার সরকার পরিচালিত বৃত্তি, উপবৃত্তি, উচ্চশিক্ষায় আর্থিক সহায়তা প্রদান, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিই যেমন উন্নয়ন করতে পারে না তেমনি শিক্ষা ব্যতীত দারিদ্র্য বিমোচনও সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম। আজকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই সুযোগটা মানুষ পাচ্ছে। তাঁদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ একটি আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. ওয়াজেদ মিয়ার কর্মময় জীবন ও স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এই ইন্টারন্যাশনাল রিসার্স ইনস্টিটিউট যে গড়ে তুলেছেন, সেটা একটি মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে- সেটাই আমি আশা করি।
অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ কে এম নূরুন্নবী রংপুর থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, রংপুর বিভাগের সংসদ সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে স্থানীয় মসজিদের খতিবের পরিচালনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে জঙ্গিবাদ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত ভিডিও কনফারেন্সে রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার ৬২৯৯টি স্থান থেকে প্রায় ৩১ লাখ মানুষ সংযুক্ত ছিলেন।
ইত্তেফাক/এএন