২০১৬ সাল জুড়ে বিশ্ব অর্থনীতি ছিল বিভিন্ন ঘটনাবহুল। জ্বালানি তেলের অব্যাহত দরপতন, ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়া যাওয়া বা ব্রেক্সিট, চীনের পুঁজিবাজারে ধস, বেশিরভাগ উন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি না হওয়াসহ বেশকিছু নেতিবাচক খবর এসেছিল অর্থনীতির জন্য। এখন নতুন ২০১৭ সালকে নিয়ে নানাভাবে পর্যালোচনা করছে অথনীতিবিদরা।
বিশ্ব অর্থনীতি হতাশা থাকলেও গতবছর বাংলাদেশের অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ছিল। বিশেষ করে পণ্য রফতানি আয় সন্তোষজনকই ছিল। চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পণ্য রফতানি আয় হয়েছে তিন হাজার ৪২৫ কোটি ডলার। তখন প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এক হাজার ৩৬৯ কোটি ডলারের রফতানি আয় হয়েছে। এক্ষেত্রে গড় প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশের কাছাকাছি। পণ্য রফতানি আয়ের ৮১ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। মূলত পোশাক রফতানির উপরই দেশের সার্বিক রফতানি পরিস্থিতি নির্ভর করে। সর্বশেষ অর্থবছরে রফতানিতে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও চলতি অর্থবছর কিছুটা কমে গেছে। এজন্য ২০২১ সালে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে মাসে গড়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নানামুখী কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জনশক্তি রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তরুণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ এখন তরুণদের দেশ। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
ইউএনডিপি বলছে, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আরও বেশি ও ভালো কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ছয় বছরের মধ্যে একক মাস হিসাবে নভেম্বর মাসে সবচেয়ে কম ৯৫ কোটি ১৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ক’বছর ধরে প্রতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও গত অর্থবছরে এসে আড়াই শতাংশ কমে যায় যা চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে। এভাবে প্রবাসী আয় কমতে থাকলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একদিকে যেমন আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে ভোগ ব্যয় কমারও আশঙ্কা রয়েছে।
বিদায়ী বছর ছিল খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত। নতুন বছরে এ মন্দা কাটবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক সুবিধায় ঋণ পুনর্গঠন ও বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের পরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিমাসেই বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক খাতে গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ছয় লাখ ৩০ হাজার ১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশে খেলাপি ঋণের হার ১০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বিদেশি ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো বাদ দিলে দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ৩৮টি ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোর মূলধন রয়েছে ৬৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেশের মোট ৫৭টির মধ্যে ৩৮ ব্যাংকের মূলধনের ৯৪ শতাংশই খেলাপি। সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একে বিপর্যয়কর বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
দেশের ব্যাপক কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শুনা গেলেও বাস্তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এ হার জিডিপির ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।
জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর নিট প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০১৫ সালের একই সময়ে তা ছিল ১০৯ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার। সে হিসাবে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের নীট প্রবাহ কমেছে ২১ দশমিক ১৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বেসরকারি বিনিয়োগ কমার কারণ হিসাবে বলা হয়, সঞ্চয়ের অভাবে নয়; বরং বিনিয়োগের অভাব। সঞ্চয়ের কিছু অর্থ যাচ্ছে রিজার্ভে আর কিছুটা পাচার হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় এখানে বিনিয়োগ পরিবেশের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুত্ সংযোগ, সম্পদ রেজিস্ট্রেশন, ঠিকাদারের সঙ্গে সমস্যা মিটাতে অধিক সময় লাগায় ব্যবসা শুরু করতে সময় লাগছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই যথাযথ পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্য পরিস্থিতির হিসাব তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, অতি দারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশে নেমে এসেছে যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের অতি দারিদ্র্য পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাসের সূচক দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কিছু নেই। লক্ষ্য করা দরকার যে, দারিদ্র্য অনেক হ্রাস পাওয়ার পরও এ দেশের দেড় কোটির বেশি মানুষ এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠি দারিদ্র্যপীড়িত সে সাথে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও অনেক। বেকার জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় না আনতে পারলে কোনোভাবেই দরিদ্র পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-র জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ দুই বছরে মাত্র ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তার মানে হচ্ছে প্রতিবছর তিন লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছে। অথচ এ সময়ে প্রতিবছর দেশের কর্মবাজারে প্রবেশ করেছে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ। সে হিসাবে মাত্র দুই বছরে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র প্রকাশিত জানুয়ারি ২০১৬’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে গত ২০১৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের হার কমেছে। আবার চলতি ২০১৬ বছরেও কর্মসংস্থান কমার আভাস দিয়েছে তারা।
বেকারত্ব দূরীকরণ বাংলাদেশের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আইএলও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় বিশ্বে বেকারত্ব বাড়ছে এমন শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় ১২তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য-উপাত্তে স্বীকার করা হয়েছে দেশে গত একদশকে বেকারত্ব বেড়েছে এক দশমিক ছয় শতাংশ। আর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে দুই শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে প্রতিবছর ২৭ লাখ মানুষ শ্রম বাজারে প্রবেশ করলেও সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পাচ্ছেন মাত্র এক লাখ ৮৯ হাজার মানুষ। ফলে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকার থাকছে। পরিণতিতে উত্পাদন কমে যাচ্ছে আর বাড়ছে ভোগের মাত্রা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ অনুযায়ী দেশে শ্রমশক্তির পরিমাণ পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ মানুষের কাজ আছে। এর অর্থ মাত্র ২৬ লাখ মানুষ বেকার। তবে জরিপেই বলা আছে পরিবারের মধ্যে কাজ করেন কিন্তু কোনো মজুরি পান না এমন মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১১ লাখ। এছাড়া আছে আরও এক কোটি ছয় লাখ দিন মজুর যাদের কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ’৯৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ। কিন্তু ২০০৫ থেকে ১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৩২ লাখে।
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে বলে মনে করেন শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থ পাচার বৃদ্ধিও অন্যতম কারণ। তাছাড়া অর্থের নিরাপত্তাহীনতায় দেশ থেকে বিপুল অংকের টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত একদশকে বাংলাদেশ থেকে ৫৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় চার লাখ ৫৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে অতিদরিদ্র লোকের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধির জন্য আয় বৈষম্য দূর করাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সে সময়ের মধ্যেই মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে সাত থেকে আট শতাংশ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি আট শতাংশে উন্নীত করতে হবে। উত্পাদনশীল খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেশে একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই অতিদরিদ্র লোকের সংখ্যা কমে আসবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা এখনই হাতে নিতে হবে।