রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রায় একই সময়ে ‘নিখোঁজ’ হওয়া সাত তরুণের এখনো সন্ধান মেলেনি। এর আগে রাজধানী থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে একজন চিকিৎসক, একজন ব্রিটিশ নাগরিক ও একজন ব্যবসায়ীকে উঠিয়ে নেয়ার ঘটনায় তাদের এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজ ও অপহৃত এই ১০ জন না ফেরায় পরিবারের মধ্যে এক ধরনের শোকের আবহ বিরাজ করছে। তারা পুলিশ ও র্যাবের দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে এখন ফিরে আসার বিষয়টি আল্লাহ’র ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে পুলিশ ও র্যাবের বক্তব্য, তারা নিজেরা আত্মগোপন করেছেন নাকি অন্য কোনো চক্র তাদের অপহরণ করেছে— তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, নিখোঁজ তরুণদের খুঁজতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। উদ্ধারের জন্য পুলিশের ওয়েবসাইটে তাদের ছবিও প্রকাশ করেছে। দেশের সকল থানায় জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে।
নিখোঁজ তরুণদের বিপথগামী হওয়ার কোনো তথ্য পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘নিখোঁজ তরুণরা সন্দেহের বাইরে নয়। এর আগে দেখা গেছে, এভাবে নিখোঁজ হওয়ার পর জঙ্গি সংগঠনেও যোগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে তাদের খুঁজে বের করতে পারলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে’।
পহেলা ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে একযোগে চার তরুণ নিখোঁজ হয়। তারা হলেন- সাফায়েত হোসেন, জায়েন হোসেন খান পাভেল, সুজন ও মেহেদি। এদের মধ্যে সাফায়েত ও পাভেল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চারজনের একযোগে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। নিখোঁজ চার জনের মধ্যে সাফায়েতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল ঘেঁটে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে সন্দেহ করছে পুলিশ ও র্যাব।
এ ব্যাপারে নিখোঁজ মেহেদির চাচা মাহবুব হাওলাদার গতকাল বলেন, ‘পুলিশ ও র্যাবের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আমরা তাদের কাছে আকুতি জানাচ্ছি, যেভাবেই হোক আমাদের সন্তানকে উদ্ধার করুন। মেহেদির বাবা জাহাঙ্গীর হাওলাদার ঝালকাঠি সদর থানায় কনস্টেবল হিসাবে কর্মরত। পুত্র শোকে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী হয়েছেন। এখন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি কবে মেহেদি ফিরবে।’
মেহেদির পারিবারিক সূত্র জানায়, বরিশাল বিএম কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মেহেদি ঢাকায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগের পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে ১ ডিসেম্বর বনানী এলাকা থেকে তার বন্ধু সুজনের সঙ্গে নিখোঁজ হন। সুজন বনানীর একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসাবে কাজ করেন। সুজনের ভাই সুমন গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে জানান, ‘আমরা তো খুঁজছি। পুলিশ ও র্যাবের কাছে অনুরোধ করছি যেভাবে হোক আমার ভাইকে উদ্ধার করুন।’
গত ৫ ডিসেম্বর সাঈদ আনোয়ার খান নামে বনানী এলাকার আরেক তরুণ নিখোঁজ হন। ও লেভেল সম্পন্ন করা এই তরুণ কলাবাগানে একটি ক্যারাতে প্রতিযোগিতায় ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ শেষে সাইকেলে বাড়িতে ফেরার সময় নিখোঁজ হন। আর বাসায় ফেরেননি। সাঈদের পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজের পর থেকেই সাঈদের বাবা-মা ভেঙে পড়েছেন। তারা ছেলেকে উদ্ধারের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও সাঈদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
৩০ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মাটিকাটার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়া কেয়ার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ইমরান ফরহাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। ইমরানের ফুফাতো ভাই মামুন বলেন, ‘দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেল আমরাতো তার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারা কোনো আপডেট দিতে পারছে না।’
গত ৩০ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর রংপুর ও পাবনা থেকে পাবনা মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের দুই ছাত্র তানভীর আহম্মেদ তনয় ও জাকির হোসেন বিপ্লব নিখোঁজ হন। দুজনের বাড়িই রংপুরে। গত ১১ ডিসেম্বর জাকির বাড়ি ফিরলেও এখন তানভীর ফিরেনি।
অপরদিকে, গত ১৪ জুলাই বনানী রেলস্টেশনের সামনে থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ইয়াসিন আলীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াসিনের বাসা মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায়। ইয়াসিনের মা ডা. সুরাইয়া পারভীন অভিযোগ করেছেন, র্যাব-১ এর সদস্যরা তার ছেলেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেছেন।
গত ১৪ অক্টোবর রাতে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে অপহূত হন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের ডা. ইকবাল মাহমুদ (৩৫)। ইকবাল মাহমুদের বাবা একেএম নূরুল আলম অভিযোগ করেছেন, তার ছেলেকে প্রশাসনের লোকজন তুলে নিয়ে গেছেন। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি নিয়ে তাদের কাছে এড়িয়ে যাচ্ছেন।
গত ২৪ অক্টোবর রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়ি থেকে ডা. খালেদ হোসেনের ছোট ভাই তারেক হোসেনকে (৩৫) সাদা পোশাক পরিহিত অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ডা. খালেদ হোসেন পরদিন উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি জিডি করেন। কী কারণে তার ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. খালেদ হোসেন বলেন, ‘ভাইকে উদ্ধারের জন্য তিনি র্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর একটি আবেদনপত্র দিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে খোঁজ নেয়া হয়। কিন্তু র্যাব ও পুলিশ থেকে জানানো হয় যে তার ভাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘আমরা তো তাদের খুঁজছি। তারা নিজেরা আত্মগোপন করেছেন নাকি কেউ তাদের অপহরণ করেছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।’