শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চায় সৌদি আরব

g শফিকুর রহমান রয়েল

 

দৃষ্টিনন্দন অলঙ্করণ। চকচকে কাচ আর উজ্জ্বল স্টিলের অপূর্ব সম্মিলন। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। শুধু কি অফিস; কর্মীরাও কেতাদুরস্ত পাদুকা পরে হাঁটছে। গায়ে ঝুলছে পাওয়ার স্যুট, নয়তো পেনসিল স্কার্ট। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে নিউ ইয়র্ক কিংবা লন্ডনের কোনো অফিস এটি। কিন্তু না, এই অফিসটির অবস্থান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন, সবচেয়ে রক্ষণশীল দেশটিতে আবার স্কার্ট এলো কোত্থেকে; সেখানে তো জনসমক্ষে নারীদের মেনে চলতে হয় কঠোর পোশাকবিধি। আবায়া খ্যাত কালো বোরকা, হেডস্কার্ফ, নেকাব ও মোজায় ঢাকা থাকে গোটা শরীর। চোখ দুটিই কেবল খোলা থাকে। ওপরে বর্ণিত অফিসটি মিডিয়া কোম্পানি রোটানার। ওখানে নারী-পুরুষ কাজ করছে একসঙ্গে। তবে এখন পর্যন্ত অফিসটিতে পুরুষরা সংখ্যালঘু।

২০১৮ সালটি সৌদি নারীদের। লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের অভিপ্রায়ে নেওয়া হয়েছে নারীদের জন্য একের পর এক ইতিবাচক পদক্ষেপ। নারীদর গাড়ি চালাতে এখন আর কোনো বাধা নেই। পুরুষের সহায়তা ও অনুমতি ছাড়াই পরিচালনা করতে পারে নিজ ব্যবসাকার্য। ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নের অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ শ্রমশক্তিতে নারীর অংশীদারিত্ব এখনকার ২২ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশতে উন্নীত করা। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে কর্মজীবী নারীদের ৭০ শতাংশই মিশ্র লিঙ্গের পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে কোনোরকম অসুবিধা অনুভব করছে না। সৌদি আরবের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষের অংশীদারিত্ব প্রায় সমান পর্যায়ে নিয়ে আসা।

২০২৫ সালের মধ্যে সৌদি আরবের ৩০ লাখ মহিলা ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  ২০৩০ সাল নাগাদ শুধু নারীদের এই গাড়িচালনার অর্থনৈতিক মূল্য দাঁড়াবে ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনেক নারীই এখন চাকরি করছে, তাও আবার মিশ্র লিঙ্গের পরিবেশে। তার মানে হচ্ছে যে, স্বামী, বাবা বা ভাইয়ের অনুমতি নিয়েই নারীরা কাজে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে সৌদি রাজ পরিবার উদার হতে শুরু করেছে, বিশেষত বাদশাহ আবদুল্লাহ। সেই রাজপরিবারেরই সদস্য তালাল বিন আব্দুল আািজজ আল সউদ হচ্ছেন রোটানা মিডিয়া কোম্পানির কর্ণধার। বস্তুত ধীরে হলেও নারীর ব্যাপারে মনোভাব পালটাতে শুরু করেছে সৌদি আরব। ব্যাংক এবং হাসপাতালে কর্মজীবী নারীর দেখা পাওয়া এখন আর বিরল কোনো ঘটনা নয়।

নারীদের শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হচ্ছে সৌদি আরবে। মুসলমানদের নেতৃত্বদানকারী এ দেশটিতে কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে একটি সহশিক্ষামূলক বিশ্ববিদ্যালয়। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণকে রাষ্ট্র উত্সাহিত করছে। শিশু ও নারীদের গৃহনির্যাতন থেকে রক্ষা করতে নেওয়া হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। এ সম্পর্কিত বিলবোর্ড প্রায়ই চোখে পড়ে। শুরা পরিষদের ১৫৬ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটিতে মহিলা রয়েছেন পাঁচজন। তাদেরই একজন ড. মাহা আলমুনিফের অভিমত, নারীর প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটছে। নারীরা ঠিকই উঠে আসবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্রহণ করা হবে অনেক বড় উদ্যোগ। অধিকাংশ লোক প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত বলে হঠাত্ করে সামাজিক নিয়ম বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। নারীদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে আস্তে আস্তে।

তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পোন্নত হতে চাইছে সৌদি আরব। কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে (নারী) বাইরে রেখে তা কীভাবে সম্ভব? কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভাবছে গভীরভাবে। রোটানা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী আল রোয়াইলি বলছিলেন, পুতুল সেজে বসে থাকার দিন শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। আমরা সূচনা করেছি। অন্যরা এগিয়ে আসবে আমাদের দেখে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় সৌদি নারীরা ঠিকই মানিয়ে নেবে নিজেদেরই।

—ইন্টারন্যাশনাল নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে