আজ হতে এক শতাব্দীর আগেকার কথা। ১৯১০ সনে দক্ষিন দিল্লীর নিভৃত জনবিরল ‘মেওয়াতে’ গুটিকয় অনুসারী নিয়ে হযরত মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভী (রহ) তাবলিগের দাওয়াতে মেহনত শুরু করলেও ইজতেমা বসে অনেক পরে। সেকালে সেখানে কোন না কোন গৃহকোনে প্রতি মাসে অন্তত একবার বসতো তাবলিগী জলসা। বয়ান করতেন মুরুব্বিরা। আর অনতিদূর থেকে আসতেন ‘ইলম’ পিপাসুরা। এভাবেই চলছিল। ছড়িয়ে পড়ছিল সু-সমাচার। হজরত ইলিয়াস (রহ) ১৩৫১ হিজরি সালে হজ থেকে ফিরে আসলেন। সাধারণ মুসলমানদের দুনিয়া ও সংসারের ঝামেলা থেকে মুক্ত করে ছোট ছোট দলবদ্ধ করে মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশে অল্প সময়ের জন্য দীনি শিক্ষা দিতে থাকেন। তবে শুরুতে তাবলিগী কাজ ব্যাপক সমর্থন পায়নি। ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। তারপর এ কাজকে আরও বেগবান ও গতিশীল করার জন্য এ উপমহাদেশের সর্বস্তরের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও বুজর্গদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করা হয় এবং মেওয়াতে সর্বস্তরের মুসলমানদের জন্য ইজতেমা বা সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়।
মুলত ১৯৪১ সালে প্রথম ঘটা করে আয়োজন করা হয় ইজতেমার। এই প্রথম ইজতেমা সম্পর্কে হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী তার ‘একটি নূরানী ইজতিমা’ ও ‘হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. ও তাঁর দীনী দাওয়াত’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন, ৮, ৯ ও ১০ যিলকদ ১৩৬০ হিজরী, মোতাবেক ২৮, ২৯ ও ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ খৃস্টাব্দে প্রথম দিল্লীর নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নূহ মাদ্রাসায় যে তাবলিগী ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়, মেওয়াতভূমির মানুষেরা এত বড় সমাবেশ ইতিপূর্বে আর দেখেনি। বাস্তবানুগ ধারণা মতে, লোকসংখ্যা ছিল বিশ/পঁচিশ হাজার। এদের একটা বিরাট অংশ নিজের সামান ও খাবারদাবার কাঁধে করে ত্রিশ/চল্লিশ ক্রোশ পথ হেঁটে হাজির হয়েছিলেন। বহিরাগত বিশিষ্ট মেহমানদের সংখ্যাও হাজারের কাছাকাছি ছিল। তারা মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার ভবনে শানদার মেহমানদারিতে ছিলেন। মজমার সুপ্রশস্ত শামিয়ানার নিচে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ) জুমার নামাজ পড়িয়েছিলেন। জামে মসজিদসহ প্রায় মসজিদে নামাজ হওয়া সত্ত্বেও প্রধান জামাতের কাতারের কারণে সড়ক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ছাদে ও বালাখানার উপরেও শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যাচ্ছিল। এ ব্যাপারে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ) এর ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় অপরিসীম ভূমিকা রাখে। মাওলানা ইলিয়াস (রহ) তাবলিগের কর্মীদের ৬টি মূল বিষয়ের উপর মেহনত করে এই আন্দোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে তাকিদ দেন। এগুলো হলো: কালিমা বা ইমান, নামাজ, ইল্ম ও যিকির, একরামুল মুসলিমিন বা মুসলমানদের সহায়তা করা, এখলাস বা বিশুদ্ধ মনোবাঞ্ছা এবং তাবলিগ বা ইসলামের দাওয়াত।
মাওলানা ইলিয়াস (রহ) সারাজীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে এই দাওয়াত ও তাবলিগ জামাত তথা বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় মজবুত ও শক্তিশালী অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন।
তাঁর ইন্তেকালের পর বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় প্রধান মুবাল্লিগ নিযুক্ত হন তাঁর সুযোগ্য পুত্র হজরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ)। তিনি তাবলিগের দাওয়াতী জামাতকে ভারতের চৌহদ্দি থেকে বের করে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে থাকেন। বলা হচ্ছে যে, এই তাবলিগের দাওয়াতের সূত্র ধরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেনের মাটিতে ৫০০ বছর পর মসজিদের মিনারে আজানের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউছুফ কান্ধলভীর (রহ) যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে তাবলিগী দাওয়াত সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। এরপরই ক্রমেই তাবলিগের কার্যক্রম বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের গন্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের সর্বত্র। ১৯৪৪ সালে বাংলাদেশে তাবলিগের মহামিলনকেন্দ্র করার নেপথ্যে ছিলেন হজরত মাওলানা ইউছুফ কান্ধলভী (রহ)। বার্ষিক ইজতেমার প্রয়োজন অনুভব করে হজরত মাওলানা ইউছুফ কান্ধলভী (রহ) মুরুব্বীদের নিয়ে পরামর্শ করেন। ঐ সময় হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ) এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাবলিগ শুরু হয়। তারপর ১৯৪৬ সলে বিশ্ব ইজতেমা সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের তাবলিগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে। পরে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা শুরু হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গির পাগারে এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে টঙ্গির ভবেরপাড়া তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ইজতেমা সেই থেকে এ পর্যন্ত সেখানেই ১৬০ একর জায়গায় তাবলিগের সর্ববৃহত্ ইজতেমা হয়ে আসছে।
কথিত আছে, তাবলিগ জামাতের মুরুব্বিদের বৈঠকে ইজতেমার স্থান নির্ধারণের জন্য নাকি লটারি হয়েছিল। সেই লটারিতে বাংলাদেশের নাম ওঠে। আর সেই থেকেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহত্ মহাসমাবেশ এ বিশ্ব ইজতেমা। ভারতের মুম্বাই ও ভূপালে এবং হালে পাকিস্তানের রায়বেন্ডে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হলেও জনসমাগমের বিচারে টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমাই বড় এবং বিশ্ব দরবারে বিশ্ব ইজতেমা বলতে বাংলাদেশের টঙ্গিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমাকেই বুঝায়।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক ইত্তেফাক