পরিবেশ

শিল্পাঞ্চলের পাশে বনাঞ্চলের গুরুত্ব

শেখ আনোয়ার

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন, এই গ্রহের আবহমণ্ডল নিষ্কলুষ এবং সুসামঞ্জস্য রাখতে হলে পৃথিবীর স্থলভাগের এক তৃতীয়াংশ বনভূমি থাকা দরকার। বিজ্ঞানীদের এই আপ্তবাক্য বেশিরভাগ দেশই কানে তোলেনি। ইদানীং উন্নত দেশগুলো বনসৃজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশে এখনও সে মাত্রায় সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় না।

বনজ সম্পদগুলোর মধ্যে অন্যতম সম্পদ কাঠ মানবজাতির জীবনের একসময় বিশেষ স্থান দখল করেছিল। পরবর্তীকালে প্রযুুক্তি বিদ্যার উত্কর্ষে চিত্রটা পাল্টাতে থাকে। খনিজ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত, কৃত্রিম দ্রব্যাদি ধীরে ধীরে বনজ দ্রব্যের স্থান দখল নিতে থাকে। কারণ এগুলো বর্তমানে সহজলভ্য এবং অপেক্ষাকৃত দামে সস্তা। এক সময় জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। কিন্তু বর্তমানে সে জায়গা দখল করেছে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, প্লাস্টিক ইত্যাদি সমন্বয়ে তৈরি বস্তু। শুধু তাই নয়, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রীও এখন বনজ দ্রব্যের বিকল্প কৃত্রিম জিনিসপত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এসব দেখে-শুনে কারো কারো ধারণা হতে পারে মানুষের কাছে বনজ সম্পদের চাহিদা বুঝি দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু না।

উন্নত দেশগুলো বন ও বনজ সম্পদের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে প্রাকৃতিক বন প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিগত শতাব্দীর মধ্যেই বন সৃজনের মাধ্যমে তার সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলেছে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর কারণে উন্নতি ও সভ্যতার অর্থ হচ্ছে বনের সংহার। শিল্পের প্রসারে বনের সংকোচন-এরকম ভ্রান্ত মতবাদ বা ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও বিদ্যমান। তাই বন ও বনজ দ্রব্য সস্পর্কে মানুষের মনে চেতনা বৃদ্ধি করাই সবার আগে বড় প্রয়োজন।

এখন বহু দেশই বুঝেছে যে, শিল্পের সঙ্গে বনের কোনো বিরোধ নেই। শিল্প এবং বনের সহবাস সম্ভব। শিল্পাঞ্চলের আশ-পাশে বনসৃজনের ফলে যে সুফল পাওয়া যায় সে সম্বন্ধে মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছে। এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এক হেক্টর বীচ বন এক বছরে প্রায় ৬৮ টন ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করতে পারে। বাতাস থেকে ধুলো-ময়লা শুষে নেবার ক্ষমতা পাইন গাছেরও আছে। এক হেক্টর পাইন বন বছরে প্রায় ৩৬ টন ধুলো-ময়লা শুষে নেয়। রোগ-জীবাণু ধ্বংসের ক্ষেত্রেও গাছের যে বড় ভূমিকা রয়েছে, এটা আজ পরীক্ষিত সত্য। ম্যাপল গাছের পাতার সংস্পর্শে রক্ত আমাশয়ের মতো রোগ-জীবাণু ধ্বংস হয়। এছাড়াও রোগ-জীবাণু বহনকারী অনেক জীবাণু বনের নির্মল বায়ুর সংস্পর্শে এসে নির্মল হয়। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে বাতাসে যে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে তা পূরণ করতে সমর্থ এসব কৃত্রিম বন। মানুষের সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে বনাঞ্চলের আশ-পাশে গড়ে তোলা হচ্ছে সবুজের প্রাচীর। উপযুক্ত বৃক্ষ প্রজাতি ও গুল্মের সৃজনে মানুষের তৈরি এই সবুজায়ন হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি বনের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে মেটাতে সক্ষম।

শিল্পাঞ্চল ও বনাঞ্চল পাশাপাশি গড়ে তোলা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়েছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেদিন আর বেশি দূরে নেই যখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারবে যে নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই শিল্পাঞ্চলের আশ-পাশে গড়ে তোলা উচিত বনাঞ্চল। মানুষের এই সবুজ চেতনাই হয়তো একদিন বন, শিল্প ও মানুষের পারস্পরিক সুসস্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। 

n লেখক:এনভায়রনমেন্টাল গভর্নেন্স বিষয়ক গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়