‘২৭ বিলের জল সরে/ ভবদহের খাল/ স্লুইস গেট বানায়ে করেছে/ মানুষ মারার কল।/ সেই কলের মুখ বন্ধ হলি/ ঘর ছেড়ে যায় চলে।’— এভাবেই গানের সুরে সুরে ভবদহের দুঃখগাঁথা তুলে ধরলেন রনজিৎ বাওয়ালী। ভবদহ এলাকার বিল পাড়ের মানুষ তিনি। ক্ষুদ্র চাষি রনজিৎ মনের সুখের জন্য মাঠে-ঘাটে গেয়ে বেড়ান গান। স্বশিক্ষিত রনজিৎ নিজে গান বানান, নিজে সুর করেন, নিজেই গেয়ে বেড়ান। লোকসঙ্গীতের শিল্পীর তকমা তার গায়ে। কিন্তু একদিন চোখের সামনে দেখলেন শিক্ষিত মানুষদের গড়া মৃত্যুফাঁদ। ওয়াপদার (আজকের পানি উন্নয়ন বোর্ড) পোল্ডার, স্লুইস গেট। দেখলেন নদীর প্রবাহকে আটকে মানুষের বিপর্যয়কে ডেকে নিয়ে আসার মহাপরিকল্পনা। একটা সময় নেমে পড়লেন মানুষকে বাঁচানোর আন্দোলনযজ্ঞে। বাম রাজনীতির আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সংঘটিত করলেন কৃষকদের। দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দিলেন মানুষকে বাঁচানোর, মুক্তির পথ বাতলে দেবার চেষ্টায়। কিন্তু কে শুনবে অশিক্ষিত এই লোকের কথা!
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে এসেছিলেন তিনি। তুলে ধরলেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবদহের মুক্তির পথ। জানালেন টিআরএম একমাত্র পথ হতে পারে মানুষের দুর্দশা লাঘবের। আর নদী বাঁচানোর। বৈঠকের সূত্র ধরে তিনি মুখোমুখি হন ইত্তেফাকের। বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা নদীতে ঢেলে নদীকে বাঁচানো যাবে না। নদীকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় টিআরএম।
টিআরএম কী : টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার হলো বিশেষ পদ্ধতিতে নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ স্থাপন করে বিলের বুককে উঁচু করে ফসল চাষের উপযোগী করা। একই সঙ্গে নদীকে নাব্য করে পরিবেশ বিপর্যয়কে রোধ করা। এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার একটি বিলকে চিহ্নিত করে নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। নদী থেকে সংযোগ খাল করে বিলের মধ্যে নদীর পানি ঢোকানো হয়। এতে জোয়ারের সময় নদীর বহন করে আনা পলি বিলে রয়ে যায়। ভাটার সময় নদীর স্বচ্ছ পানি বিল থেকে বের হয়ে যায়। এতে একদিকে বিল উঁচু হয়। অন্যদিকে গভীরতা বৃদ্ধি পেয়ে নদী নাব্য হয়। এভাবে জোয়ারভাটার সঙ্গে নদীর জীবন্ত হয়ে ওঠা আর বিল গঠন মানুষের ফসল ফলানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতিই হলো টিআরএম।
রনজিত বাওয়ালী বলেন, ‘টিআরএমের ব্যাপারে পাউবো’র আগ্রহ কম। কারণ এতে কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হয় না। পকেট ভারির জন্য দরকার বড় বড় প্রকল্প। মানুষের সংকটকে পুঁজি করে ওরা চায় নদী কাটার প্রজেক্ট বানাতে। কিন্তু জীবন্ত নদী কেটে নদী বাঁচানো যাবে না। যেসব নদী শুকিয়ে গেছে, সেসব নদী কাটতে হবে। আর চালু থাকা নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ স্থাপন করে টিআরএম করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, প্রতি একশ’ লিটার পানিতে ছয় লিটার পলি আসে। এজন্য এই নদী মেশিন দিয়ে কেটে কোনোদিনই বাঁচানো যাবে না। কারণ জোয়ারের সঙ্গে পলি এসে জমাট হয়ে যায়। দেখা গেছে নদী কাটার পর দুই থেকে তিন জোয়ারের পানিতেই নদী আবার আগের মতো ভরাট হয়ে গেছে। ঘণ্টায় তিন কিলোমিটার জোয়ার যেতে না পারলে পলি জমবেই। আবার কাট পদ্ধতিতেও পাউবো ভুলভাবে নদী কাটে। এতে নদী বাধাগ্রস্ত হয়। নিয়ম বিলের সোজাসুজি কাটা। কিন্তু ওরা কাটে অ্যাঙ্গেল করে।
তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরার পাখিমারা বিলে টিআরএমের সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে। এতে ঝিকরগাছা পর্যন্ত কপোতাক্ষ নদে দুই-তিন ফুট জোয়ার আসছে। তবে ২০১২ সালে বিল কপালিয়ায় মানুষ কেন টিআরএমের বিরোধিতা করেছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিত বাওয়ালী বলেন, ‘সেখানে পাউবো’র পরিকল্পনায় ভুল ছিল। মানুষের সঙ্কটকে পুঁজি করে ওরা সরকারের বরাদ্দ হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল। আর সরকারি দলের রাজনীতির নোংরা খেলারও শিকার হয় সাধারণ মানুষ।’
ইত্তেফাক/এএম/ইউবি