সুরগাঁও’-এর মুগ্ধতার সন্ধ্যা


অতীত আর বর্তমানের মধ্য দিয়ে ‘সুরগাও’-এ ততোক্ষণে দেখানো হয়ে গেছে ভবিষ্যত্। সক্রেটিসের বিষের পাত্রে হেমলক পান করানো হয়েছে মহাকাল আর বর্তমানের সমন্বয়কারী আনাল ফকিরকে। কালরক্ষী অত্যাচারী সেনা প্রধানেরও অস্ত্র কেড়ে নিয়ে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে অসুরতা দূর করার প্রতীক বাঁশি। দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি থেমে গেছে। নাটকের কলাকুশলীরা মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তখনো গভীর এক মন্ত্রমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন পুরো নাট্যমঞ্চ। দু-ঘণ্টা সময় যেন ফুরিয়ে গেছে মাত্র দু’মিনিটেই। অথচ এরইমধ্যে দেখা হয়েছে প্রত্নকাল থেকে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।

শুক্রবার সন্ধ্যায় এমনই এক মুগ্ধতায় ‘সুরগাঁও’ ঘুরে এলেন শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চের প্রায় ৮৫০ জন দর্শক। মাসুম রেজার রচনা ও নির্দেশনায় এবং দেশনাটকের ২২তম প্রযোজনায় মঞ্চায়িত হলো ‘সুরগাঁও’। নাটকের মূল্যায়ন করতে এসে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর বক্তব্য ছিল, ‘অনেকদিন পর একটি থিয়েটার দেখে মন ভরে গেছে।’

সুরগাঁওয়ে আনাল ফকির, আসমান, ছুহি, হাক্কা ব্যাপারি, বাঁশিবুড়ি, ওষ্ঠকালা, নীহাররঞ্জন, কাবিল, কুশি ও মুজাহেবদের বাস। গ্রামের গোড়াপত্তনকারী আনাল ফকির ১৮০ বছর আগের কোনো একরাতে হঠাত্ উধাও হন। বাঁশিবুড়ির হাতে দিয়ে যান এক মোহন বাঁশি। বলে যান বাঁশির সুর দিয়ে মানুষের ভেতরের অসুরতাকে দূর করতে। সেই থেকেই বাঁশিবুড়ি থানা থেকে আসামি নিয়ে এসে বাঁশি বাজানো শেখায়। আর আসমান তার চার পুরুষের পরের বংশধর এবং ভবিষত্ দ্রষ্টা। সে দেখে তার ‘চাইর দাদা’ আনাল ফকির আবার গাঁয়ে ফিরছেন। একদিন সত্যিই হাজির হন আনাল ফকির। সময়ের বিপরীতে ১৮০ বছর প্রত্নকাল ভ্রমণ করেন তিনি। পাণ্ডব ভার্যা দ্রোপদী, সক্রেটিসের বন্ধু ক্রিটো ও দামেস্কোর আমীর অমূল্য কিছু উপহার দেন তাকে। কালের বিপরীতে ভ্রমণ ও কালের গর্ভ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে তাম্রসেনার দল ঢুকে পড়ে সুরগাঁওয়ে। কালরক্ষীর পরিচয় দেওয়া সেনারা সময়কে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে চায়। সুরগাঁওয়ে শুরু হয় সুর আর অসুরের দ্বন্দ্ব। এই নাটকের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্দেশনায় ফিরলেন দেশের খ্যাতিমান নাট্যকার মাসুম রেজা। তাই নাট্যমঞ্চে প্রবেশের আগেই নাটক দেখতে হলো দর্শকদের। ভিড়ের মধ্যে টিকেট সংগ্রহে ব্যর্থ কয়েকজন নারীকে দেখা গেল আফসোস করতে। তরুণদের বেশ বেগ পোহাতে হলো এই কাজে। যা রীতিমতো নাটকীয় ঘটনা ছিল ওই গেটের পাহারায় থাকা নজরুলের কাছে। জানালেন, স্মরণকালের ইতিহাসে থিয়েটারে টিকেটের জন্য এত চাপ দেখেননি তিনি।

পুরো নাটকজুড়েই ফুটে উঠেছে অতীত ও বর্তমান সমাজের নানা অসঙ্গতি। ধর্মযুদ্ধ, অবিচার থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠীর নানা অত্যাচারের দৃশ্য। নাট্যমঞ্চের লাইটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড সবই ছিল এক ছন্দে। তাই তো অভিনয় আর সুরের মূর্ছনায় দু-ঘণ্টা সময় ফুরিয়ে গেল দু’মিনিটেই! উদ্বোধনী প্রদর্শনী দেখতে এসে ঘুরে গেছেন প্রায় ৩ শতাধিক দর্শক। আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি নাটকটি আবারো প্রদর্শিত হবে শিল্পকলা একাডেমিতে।