দখল-দূষণের কবলে মুক্তাঙ্গন

 
দখল-দূষণের কবলে মুক্তাঙ্গন পার্ক। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার ছিল রাজধানীর মুক্তাঙ্গন পার্ক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে এই পার্ক। অথচ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় পার্কটি হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পার্কটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে না।
 
এক সময় যে প্রাঙ্গণের চারপাশে ছিল সারি সারি গাছ, এখন সেই প্রাঙ্গণে সারি সারি গাড়ি। যে পার্কে শিশুরা খেলা ও বয়স্করা ব্যায়াম করতেন। গাড়ি পার্কিং ও রেন্ট এ কারের দখলে চলে গেছে রাজধানীর অন্যতম কেন্দ্রে অবস্থিত মুক্তাঙ্গন পার্ক। প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা  দখল করেছেন পার্কটিকে ।
 
মুক্তাঙ্গন পার্ককে ঘিরে গড়ে উঠেছে একাধিক মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কারের স্ট্যান্ড। সরকারের কোনো রকমের অনুমোদন ছাড়াই এখানে দিনরাত শতাধিক মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার রাখা হচ্ছে।
 
ঢাকা মাইক্রোবাস ও কার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহের হোসেন খান বলেন, তারা ৩০ থেকে ৩৫ বছর যাবত্ মুক্তাঙ্গন পার্কটি দখলে রেখেছেন। তাদের কোনো রকমের অনুমোদন নেই। তবে তারা জমি লিজ চেয়ে ডিএসসিসির কাছে আবেদন করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন তাদের মৌখিকভাবে গাড়ি রাখার অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানান।
 
এ ব্যাপারে মেয়র সাঈদ খোকনের সাঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পার্কে গাড়ি রাখার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পার্কটি উদ্ধার করা হবে। ইতিপূর্বেও পার্কটিতে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। মুক্তাঙ্গনকে একটি আদর্শ পার্ক হিসাবে গড়ে তোলা হবে।
 
এদিকে পার্কের উত্তর কোণে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখান থেকে ঢাকা মহানগর এসবি পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে উপ-পুলিশ পরিদর্শক শওকত আলী বলেন, দীর্ঘ দিন যাবত্ এ অফিসটি পরিচালিত হয়ে আসছে। তিনি জমির অনুমোদনের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
 
মুক্তাঙ্গন পার্কের মাঝখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছে হোম এইড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য গোসলখানাসহ ৮ কক্ষ বিশিষ্ট একটি টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। টয়লেটের তত্ত্বাবধায়ক মোবারক হোসেন জানান, টয়লেটে ৫ টাকা, গোসলে ১০ টাকা আর লকারে জিনিসপত্র রাখতে ৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন বলে তিনি জানান। মেয়র সাঈদ খোকন মুক্তাঙ্গন পার্ক টয়লেটটি উদ্বোধন করেন গত ৫ জানুয়ারি।
 
 পার্কের ভিতর মুক্তাঙ্গন জামে মসজিদ নামে একটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে পার্কের দখলকারী ও আশপাশের লোকজন নামাজ আদায় করে। এই মসজিদটিরও কোনো অনুমোদন নেই বলে জানান মাইক্রোবাস ও কার মালিক সমিতির নেতারা।
 
মুক্তাঙ্গন পার্ক দখল করে এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পল্টন থানার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তাঙ্গন ইউনিটের আওয়ামী লীগের কার্যালয়। এ ব্যাপারে পল্টন থানার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেলিম বলেন, এই অফিসটি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর সাথে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। কতিপয় চি?িহ্নত ব্যক্তি আওয়ামী লীগের দুর্নাম করতেই এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে।
 
এছাড়া হকারদের অর্ধশতাধিক খোলা দোকান-পাট রয়েছে পার্কের দক্ষিণ কোণে। এখানে নতুন ও পুরনো নানা কাপড় বিক্রি করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার জানান, পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মচারী তাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে মাসোহারা আদায় করে থাকেন।
 
এছাড়া ইসলাম এ্যাকুরিয়াম নামে মাছ ও খাবার বিক্রির দোকান গড়ে তোলা হয়েছে এখানে। দোকানের মালিক শহিদুল ইসলাম বাচ্চু জানান, এটি বিআরটিসির একটি যাত্রী ছাউনি ছিলো। তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে এটি ভাড়ায় ব্যবহার করছেন। প্রতি মাসে তিনি বিআরটিসি কর্তৃপক্ষকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা করে ভাড়া দেন বলে জানান।
 
সর্বোপরি একটি ময়লার ভাগাড়ও তৈরি হয়েছে এখানে। ময়লার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। প্রতিদিনই এখানে ময়লা ফেলা হলেও তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না নিয়মিতভাবে। স্থানীয়রা ময়লার ভাগাড়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
 
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সূত্র জানায়, পাকিস্তান আমলে প্রায় ৮৪ শতাংশ ভূমি জুড়ে মুক্তাঙ্গন পার্কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নগরবাসীর ভ্রমণকেন্দ্র হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা অফিসের কাজ শেষে এ পার্কে ব্যায়াম কিংবা ভ্রমণ করতেন। জেনারেল পোস্ট অফিসের (জিপিও) পশ্চিম দিকে অবস্থিত পার্কটি ঘিরে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও আয়োজন করা হত। নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের সময় থেকে মুক্তাঙ্গন পার্কটিতে প্রায় প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ হত। রাজনৈতিক ও শ্রমিক কর্মসূচির কারণে পার্কের গাছগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
 
সাবেক শিক্ষা উপসচিব আশরাফুল আলম বলেন, চাকরিরত দিনগুলোতে প্রায় বিকালেই অফিস শেষে মুক্তাঙ্গনে তিনি বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুরাও বেড়াতে আসত।
 
নব্বইয়ের দশকেই পার্কটিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ১৯৯০ সালের পর থেকেই পার্কটিতে দখলদারি শুরু হয়।
 
ঢাকা মাইক্রোবাস কার ওনার্স এসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের ও যুবলীগের প্রভাবশালী দুই নেতার আশ্রয়ে পার্কে রেন্ট এ কার ব্যবসা চলছে। তাদের প্রভাবের কারণেই সিটি করপোরেশন বেশ কয়েকবার পার্কটি দখলমুক্ত করতে গিয়েও সফল হয়নি।