শ্রীপুরে গণহত্যা

সুস্মিতা দাস

বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল এদেশের মানুষের ওপর। এ হত্যাযজ্ঞে তাদের দোসর ছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে তারা গণহত্যা চালায়। ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর ‘সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’ অভিযান পরিচালনা করে পাকিস্তানি বাহিনী। এতে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত গণহত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রাম শ্রীপুরের সাধারণ মানুষও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার শিকার হয়।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় একমাস পর্যন্ত নোয়াখালী ছিল শক্রমুক্ত। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি বাহিনী বৃহত্তর নোয়াখালীতে প্রবেশের জন্য কুমিল্লা থেকে রেলপথে লাকসাম হয়ে নোয়াখালীর দিকে এবং চট্টগ্রাম থেকে রেল ও সড়ক পথে ফেনীতে প্রবেশের জন্য যাত্রা শুরু করে। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে সোনাইমুড়ীর বগাদিয়া, বেগমগঞ্জ কালাপুল, ফেনী ছাগলনাইয়া সড়কের ব্রিজ ধ্বংস করে দেয়। যেসব রাস্তা পাকিস্তানি বাহিনী ফেনী-নোয়াখালীতে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করা হয়, পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে সেসব স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের মুখে তাদের প্রতিরোধ সফল হয়নি।

১৫ জুন, ১৯৭১। পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিতে তিনদিক থেকে শ্রীপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। মধ্য দুপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৫-২০টি গাড়ি শ্রীপুর গ্রামের প্রধান সড়কে এসে থামে। তাদের সঙ্গে সেদিন স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ছিল। তাদের মুখ ছিল কালো কাপড়ে বাঁধা। শ্রীপুরের রাস্তা ধরে সামনে অগ্রসর হয়ে তারা রেললাইনের কাছে আসে। এখান থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা তিনটি দলে ভাগ হয়ে যায়—একটি দল দক্ষিণে সোনাপুর হয়ে বেড়িবাঁধ দিয়ে, আরেকটি দল উত্তরদিকে কবরস্থানের পাশ দিয়ে এবং অন্যদলটি আহম্মদীয়া স্কুলের সামনের সোজা রাস্তা ধরে অগ্রসর হয়। শ্রীপুরের দিকে সোজা রাস্তায় যে দলটি যায়, পথিমধ্যে তারা আহম্মদীয়া স্কুলের মাঠে ট্রাকে কাজ করা অবস্থায় ট্রাকমালিক ও ট্রাকের হেলপারকে গুলি করে হত্যা করে। ট্রাকমালিক আলী করিম (তোতামিয়া) তাঁর ট্রাকটি মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবহনে ব্যবহার করেছিলেন। আরো সামনে গিয়ে পুকুর পাড়ে বসে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি করে। এরপর একের পর এক বাড়িতে ঢুকে যাকে সামনে পেয়েছে গুলি করে হত্যা করতে থাকে। দক্ষিণদিকের দলটি প্রথমে একটি বাড়িতে ঢুকে আবদুল কাদের (পুলিশ) ও তার ভাইকে হত্যা করে। এরপর পূর্বদিকে গিয়ে হত্যা করে আরো ৮-১০ জনকে। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যার পাশাপাশি তারা নারীদের ধর্ষণ করেছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। এসব কাজে তাদেরকে সহায়তা করেছে রাজাকাররা।

গ্রামের মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো ছুটে গ্রাম থেকে পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী চলে গেলে সন্ধ্যার পর গ্রামবাসী গ্রামে ফিরতে শুরু করে। ফিরে তারা দেখে শুধু লাশ আর লাশ। বাড়িঘর আগুনে পোড়ানো। তারা যখন পরিবারের লাশগুলো সত্কার করার প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন তারা শুনতে পায় পাকিস্তানি বাহিনী আবার গ্রামে আসছে। লাশ রেখেই সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। যদিও সে রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আর আসেনি। পরের দিন ভোরে ফিরে যাকে যেখানে সম্ভব হয়েছে দাফন করেছে।

১৫ জুনের গণহত্যায় তোতা মিয়া, ইয়াসিন, আবদুল কাদের, আবু তাহের, আলী আক্কাস, আবদুল কাইয়ুম, সাখায়েত উল্যা, ইউসুফ, জোসেফ সোয়ারিশ ও মোয়াজ্জম হোসেনসহ শতাধিক মানুষ শহীদ হন। শহীদ সবাইকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শ্রীপুরে যাওয়া-আসার পথে সোনাপুর ও মধ্য করিমপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী অনেককে গুলি করেছে, বাড়িঘর আগুন দিয়েছে এবং নারী নির্যাতন করেছে। এছাড়া সোনাপুর বাজারে বাইরে থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসত। তাদের মধ্যে অনেকেই সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছে—তাঁদের অনেকের নাম পরিচয় জানা যায়নি।

১৫ জুনের গণহত্যা স্মরণে শ্রীপুর আহম্মদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ৪৮ জনের নাম-পরিচয়সহ ‘স্মৃতি অম্লান’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে নোয়াখালীতে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনজনকে ফাঁসি ও অপর একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। বাকিদের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এদের বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হলে শহীদ পরিবারের দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

নোয়াখালী