প্রতি বছর মসলা জাতীয় পণ্য আমদানি করতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। তাই আমদানি ব্যয় কমাতে বা বিকল্প পণ্য হিসাবে বেশ কিছু মসলা পণ্য দেশে উত্পাদন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ রয়েছে। এ খাতে দেওয়া ঋণের উপর সরকার থেকে ভর্তুকিও পায় ব্যাংকগুলো। তারপরও এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অনীহার শেষ নেই। ফলে বছর শেষে দেখা যায় আশানুরূপ ঋণ বিতরণ হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ বৈদেশিক ব্যয় কমাতে ডাল, তৈলবীজ, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, জিরা ও ভুট্টা চাষে ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা চালু করেছে সরকার। ব্যাংক থেকে কৃষক পর্যায়ে চার শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয়। আর আর ভর্তুকি হিসাবে ৬ শতাংশ দেয় সরকার। এতে করে ব্যাংক মোট ১০ শতাংশ সুদ পায়। সেক্ষেত্রে সুদ ক্ষতি বাবদ প্রদত্ত ৬ শতাংশ হিসাবে নেওয়ার পর কোন ব্যাংকের কিছুটা সুদ ক্ষতি হলেও ওই অংশটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্পোরেট সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) হিসেবে দেখানোর সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে অর্থবছর শেষে অনার্জিত অংশ বিনা সুদে একবছরের জন্য কেটে রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও অর্থবছরের শুরুতে এ খাতে কী পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হবে— ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সেই লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এত উদ্যোগ নেওয়ার পরও কাঙ্খিত ফলাফল মিলছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) মসলা চাষে ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিতরণ হয়েছে মাত্র ৩০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৩৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আগের অর্থবছর ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ কোটি ৭ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে একই সময় পর্যন্ত বিতরণ হয়েছিল ৩০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এতে আগের বছরের তুলনায়ও বিতরণে পিছিয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো। এছাড়া অর্থবছরের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও এ খাতে এক টাকাও দেয়নি ১৯ ব্যাংক।
ঋণ না দেওয়ার তালিকায় রয়েছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল), বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া, ডাচ-বাংলা, সিটি, এনসিসি, প্রিমিয়ার, শাহজালাল ইসলামী, ফারমার্স, এনআরবি কমর্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়া বিদেশি মালিকানার সিটি ব্যাংক এনএ, হাবিব, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরী, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এ খাতে কোনো ঋণ দেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক বলেন, নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যাংকগুলোকে কম সুদের এ ঋণ দিতে হয়। আর সুদ ভতুর্কীর টাকা পেতে কিছুটা সময় লাগে। যে কারণে অনেক ব্যাংক এধরনের ঋণ বিতরণে অনীহা দেখায়। যদিও ঋণ বিতরণ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাগিদ দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
মসলা গবেষণাকেন্দ্রের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ২৭ প্রকার মসলা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ১৭টি মসলা দেশে চাষ হয়। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ ও ধনিয়া বেশি আবাদ হয়। বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪ লাখ টন মসলা জাতীয় ফসল উত্পাদন হচ্ছে। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বছরে আরও ৪ লাখ টন মসলা আমদানি করতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশের উত্পাদন ও আমদানি মিলে মাথাপিছু দৈনিক ২৪ গ্রাম মসলার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। অথচ দৈনিক প্রয়োজন মাথাপিছু ৪৫ গ্রাম। এ হিসাবে মসলা গ্রহণে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় শতকারা ৩৭ ভাগ।
ইত্তেফাক/এসএসএ