অ্যালিয়েন নিয়ে সিআইএ’র গোপন নথি প্রকাশ


তাদের’ অস্তিত্ব আছে কি নেই এ নিয়ে সেই কবে থেকে তর্ক-বিতর্ক চলছে। অস্তিত্বের পক্ষে এক পক্ষ যদি ‘প্রমাণ’ নিয়ে হাজির হয়, তাহলে আরেকটি পক্ষও ওই দাবি মিথ্যা প্রমাণে উঠেপড়ে লাগে। এতকিছুর পরও ‘আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট’ বা ‘ইউএফও’ মহাকাশের রহস্যে যারা মুদে থাকতে পছন্দ করেন তাদের ভাবনায় খোরাক জুগিয়েই চলছে।

হলিউড ও বলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় ভিনগ্রহের প্রাণী বা অ্যালিয়েন কিংবা ভিনগ্রহের মহাকাশ যানের কাল্পনিক ইমেজ দেখতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন গল্প উপন্যাসে দেখানো হয়েছে ভিনগ্রহের প্রাণীদের। তাতে ‘তাদের’ এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যে, কোথাও তারা নেমে পড়ে ঝুপ্? করে! আবার কখনও-বা তারা আকাশে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চক্কর মেরে আমাদের ওপর ‘কড়া নজর’ রেখে উধাও হয়ে যায় হঠাত্ করেই! তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘তাদের’ দেখানো হয়েছে ধ্বংসকারী ও সভ্যতার বিনাশকারী হিসেবে।

গত ৫০ বছরে আমাদের পৃথিবীতে ভিনগ্রহের প্রাণীদের বারবার আসা-যাওয়ার যে সব তথ্যপ্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মিলেছে, আর সে সব সম্পর্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সেনা কর্মকর্তা, নাসার সাবেক কর্মী ও পুলিশ অফিসাররা যা বলেছেন বা লিখেছেন, সেই সব ‘গোপন নথি’ আর্কাইভ থেকে বের করে গত সোমবার সরাসরি      অনলাইনে প্রকাশ (ডি-ক্লাসিফাই) করল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি’ বা ‘সিআইএ’।

১৯৯৫ সালে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ‘ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ সিআইএ’র ‘গোপন নথি’ বা ‘কনফিডেন্সিয়াল ফাইল’গুলোকে আমজনতার জন্য প্রকাশ করতে বলেছিলেন। ২০ বছর পর সিআইএ সেই সব নথিপত্র প্রকাশ করতে শুরু করল।

প্রথম পর্যায়ে মোট এক কোটি ২০ হাজার পাতার সেই ‘গোপন নথি’ প্রকাশের পরপরই যেমন অ্যালিয়েনদের সম্পর্কে উত্সাহের পালে আরো জোরে বাতাস লাগতে শুরু করেছে, তেমনই ওই সব তথ্যপ্রমাণ, সাক্ষ্যের বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কসমোলজিস্টরা। আবার যে বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মাণ্ডের এখানে-ওখানে প্রাণের সন্ধান করে চলেছেন, তাদের বুকের বল বাড়িয়ে দিয়েছে সিআইএ’র প্রকাশ করা ওই সব ‘গোপন নথি’।

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ইউএফও দেখতে পাওয়ার ঘটনার মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ করা যাক।

এক. ১৯৯৬ সালের ২৫ জুন লিথুয়ানিয়ায় গভীর রাতে আকাশে একটি ‘উড়ন্ত চাকি’ দেখে সংজ্ঞাহীন হয়ে গিয়েছিলেন ওই এলাকায় টহলরত দুই পুলিশ অফিসার। ঘটনাটি পুলিশের রেকর্ডে আসে তার পরের দিন, ২৬ জুন। সিআইএ’র প্রকাশ করা ‘গোপন নথি’তে ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয়েছে :

‘ওই ইউএফও দেখা গিয়েছে, এমন খবর পাওয়ার পর সেনাবাহিনী, র্যাপিড রিঅ্যাকশন ফোর্স, স্নিফার ডগ ও পুলিশ-কর্মীদের নিয়ে একটি ট্রাক সেখানে পৌঁছায়। তারা গিয়ে ওই এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের বলেন, তারা বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাতের অন্ধকার আকাশে একটি গোলাকার বস্তুকে ঝুলতে দেখেছেন। ভাসতে দেখেছেন। আর সেটা থেকে আলো ছিটকে বেরিয়ে আসছিল। তার সঙ্গে একটা অদ্ভুত রকমের শব্দও তারা শুনতে পেয়েছেন। অনেকটা বজ ্রপাত হলে যেমন বিদ্যুতের ঝিলিক দেখা যায়, প্রায় সে রকমই। তা দেখে টহলরত পুলিশকর্মীরা ঘন ঝোপের মধ্যে দিয়ে প্রায় ৫০ মিটার হেঁটে ওই ‘উড়ন্ত চাকি’র কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখন সেই আকাশে ‘ঝুলে থাকা’ গোলাকার বস্তুটি দূরে চলে যায়। আকাশের আরো ওপরে উঠে যায়। তার পর ধীরে ধীরে দূষ্টির বাইরে চলে যায়। কিন্তু তার পরও ওই এলাকায় পুলিশকর্মীরা বজ পাতের মতো  শব্দটা শুনতে পেয়েছেন আরও বেশ কিছুক্ষণ ধরে। লিথুয়ানিয়ার বিজ্ঞানীরা ওই ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। যে পুলিশকর্মীরা ওই ঘটনাটি দেখেছিলেন, তারা কেউই মানসিক প্রতিবন্ধী নন বা অসুস্থও ছিলেন না। কিন্তু ঘটনাটি দেখার পর তারা সংজ্ঞাহীন হয়ে যান।’’

দুই, সিআইএ’র ‘গোপন নথি’ জানাচ্ছে, ২০০১ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবে দেখা মেলে একটি ‘উড়ন্ত চাকি’র। একটা পরমাণু বোমা ফাটানো হলে যেমন তার আলোয় ঝলসে যায় চারপাশের বিশাল একটা এলাকা, তেমনই আলোর ঝলক দেখা গিয়েছিল ওই দিন ‘উড়ন্ত চাকি’ কাছে এসে পড়ার পর।

তিন, সিআইএ’র ‘গোপন নথি’ জানাচ্ছে, ১৯৮১ সালে চিলির বালগাড্ডায় একটি ‘উড়ন্ত চাকি’ নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য মাটিত নেমে পড়তে দেখা গিয়েছিল ভিনগ্রহের প্রাণিদের। মিনিট পনেরো পরেই ওই ‘উড়ন্ত চাকি’তে চেপেই সেই অ্যালিয়েনরা আবার আকাশে উড়ে গিয়ে উধাও হয়ে যেতে দেখা যায়।

সিআইএর সদ্য প্রকাশিত ওই ‘গোপন নথি’ সম্পর্কে কী বলছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কসমোলজিস্টরা?

আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর রবি নায়েকের কথায়, ‘‘আমরা ওই সব ‘উড়ন্ত চাকি’র ছবি দেখেছি ঠিকই। তবে সেগুলিকে যেহেতু আমরা নাগালে পাইনি বা আমাদের মতো বিজ্ঞানীরা সামনে থেকে তাদের আকাশে ভাসতে বা ঝুলতে দেখিনি, তাই সেগুলি আদতে কী, তা নিয়ে আমাদের স্পষ্ট কোনও ধারণা নেই। হতে পারে তা কোনও মহাজাগতিক বস্তুর খণ্ড-বিখণ্ড দেহাবশেষ। তবে জিমি কার্টার যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন এমন একটি ঘটনা তিনি নিজে টেক্সাসে দেখেছিলেন বলে তার ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছিলেন। পরে সেই ঘটনার তদন্তের জন্য প্রশাসনিক নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা ঘন ঝোপের কিছুটা অংশ পুড়ে যাওয়ার ‘চিহ্ন’ ছাড়া আর কোনো তথ্যপ্রমাণ ওই এলাকায় মেলেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ছিল, অ্যালিয়েনদের ‘মহাকাশযান’ মাটিতে নেমেছিল বলেই, তার ‘পদচিহ্ন’ মিলেছিল ওই পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ঘন ঝোপের একাংশে।’’

তবে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কসমোলজি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘এই ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণ শুধুই পৃথিবীতে রয়েছে, অনেক বিজ্ঞানীরই এমন জোরালো বিশ্বাস নেই। বরং যত দিন যাচ্ছে, ততই বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই ধারণা জোরালো হচ্ছে, এই বিপুল ব্রহ্মাণ্ডে আমরা কখনওই একটি বিচ্ছিন্ন ‘এনটিটি’ হতে পারি না। শুধু পৃথিবীতেই সভ্যতা হয়েছে, ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও কোনও কালে কোনও সভ্যতা গড়ে ওঠেনি, তা ধ্বংসও হয়নি বা নতুন নতুন সভ্যতা তার পরেও গড়ে ওঠেনি, এমন কথারও তো কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আমরা এই ব্রহ্মাণ্ডের এক শতাংশও এখনও পর্যন্ত জানতে পারিনি। স্টিফেন হকিংও একই কথা বলছেন। তাই তিনি ভিনগ্রহীদের খোঁজার ‘ইনিশিয়েটিভে’রও শরিক হয়েছেন। জোরালো থেকে আরও জোরালো নতুন নতুন টেলিস্কোপ বানানো হচ্ছে। ২০১৮ সালেই নাসা মহাকাশে পাঠাচ্ছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। বিভিন্ন সৌরমণ্ডলে ‘হ্যাবিটেব্?ল জোনে’ বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে, ভিনগ্রহীদের ‘তল্লাটে’র তল্লাশে। অণুজীব তো আছেই এই ব্রহ্মাণ্ডের অন্যত্র, আমার জোরালো বিশ্বাস এমনকি উন্নত প্রাণ বা হয়তো সভ্যতাও রয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ডের এন্য কোথাও, অন্য কোনও খানে। আর আমার মনে হয়, সেই সব আমাদের চেয়ে আরও অনেক আগে তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর জন্ম তো এই সবে, মাত্র সাড়ে ৪০০ কি ৫০০ কোটি বছর আগে। কিন্তু ‘বিগ ব্যাং’টা তো হয়েছিল তারও বহু বহু গুণ আগে। ১৩৭০ কোটি বছর আগে। তাই কেনই-বা সভ্যতা থাকতে পারবে না ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনও প্রান্তে? তার হদিশ আমরা হুট করে পাব কি না, তা বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা যেমন ভিনগ্রহীদের সন্ধান পেতে টেলিস্কোপ বানাচ্ছি, মহাকাশযান পাঠাচ্ছি এখানে ওখানে, তেমনই ‘উড়ন্ত চাকি’র মতো কিছু পাঠিয়ে সেই ভিনগ্রহীরাও তো নজর রাখার চেষ্টা করতে পারে আমাদের ওপর!’’ সূত্র আনন্দবাজার পত্রিকা ও ইন্টারনেট।

ইত্তেফাক/এসএসএ