আগামী ৩০ নভেম্বর জাতীয় আয়কর দিবস হিসেবে পালিত হবে। ওই দিনই চলতি বছরের আয়কর দেওয়ার শেষ দিন। আগামী ৩০ নভেম্বর আয়কর দিবস পালিত হলেও ওই দিন সরকারি ছুটির দিন। এ জন্য পরবর্তী অফিস খোলার দিন কোনো জরিমানা ছাড়াই করদাতারা আয়কর রিটার্ন জমা ও কর প্রদান করতে পারবেন। এরপর রিটার্ন জমা দেওয়া হলে প্রতিদিনের জন্য পূর্বের বছরের দেওয়া করের ২ শতাংশ হারে জরিমানা গুনতে হবে।
আগামী দুই বছরের মধ্যে সারা দেশের আয়কর শনাক্তকারী নম্বর বা টিআইএনধারী মানুষের সংখ্যা আরো ২০ লাখ বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এবারের আয়কর মেলায় আগত আগ্রহী করদাতার ভিড় দেখে স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদী হয়েছি। এটা সুস্পষ্ট যে, দিনে দিনে কর দিতে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছে। কর মেলায় গিয়ে এখন অনেকেই নতুন ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নিচ্ছেন প্রতিবছরই।
ইটিআইএন নেওয়ার ফলে নতুন করে তারা করদাতার তালিকায় নাম লেখালেন। নতুন যে ই-টিআইএন নেওয়া হচ্ছে, এর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের কম। এর মানে, ই-টিআইএনধারীর একটি বড় অংশই তরুণ। তারাই ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় ধরে কর দেবেন। গত অর্থবছর থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের আয়কর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে করে আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে বলা যায়। কারণ বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই এতদিন রিটার্ন জমা না দেওয়ায় আয়করের গণ্ডি মুক্ত থাকতে পারতেন। এখন থেকে প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এনবিআরে জানাতে হবে কোন কোন কর্মীর কর শনাক্তকরণ নম্বর আছে, কারা রিটার্ন নিয়েছেন। যেসব কর্মীর কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকবে না, তাদের বেতনভাতা ওই প্রতিষ্ঠান খরচ হিসেবে দেখাতে পারবে না। এর আগের বছর টিআইএন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এতে বেসরকারি চাকরিজীবীদের সিংহভাগই করজালের আওতায় চলে এসেছেন বলা চলে। এত অগ্রগতির পরেও বলতে হয় আয়কর কী, কেন দিতে হয়- এ সম্পর্কে দেশের অনেক মানুষেরই কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আজও অনেকের কাছে আয়কর একটি ভীতিকর ব্যাপার।
রাজস্ব কর্মকর্তা আর করদাতার ভয়, আতঙ্ক আর লুকোচুরির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে আয়কর মেলা। আয়কর মেলায় গিয়ে দেখা গেছে রাজস্ব কর্মকর্তা কর্মচারীরা হাসিমুখে করদাতাদের সেবা দিচ্ছেন। আর করদাতারাও এ সেবা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। ২০১০ সালে প্রথমবারের আয়কর মেলায় ৬০ হাজার ৫১২ জন মানুষ সেবা নিতে আসেন। আর সম্প্রতি শেষ হওয়া আয়কর মেলায় সেবা গ্রহীতার সংখ্যা ১৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৬ জন। এখন সাধারণ মানুষ আসলে কর দিতে চায়, আয়কর মেলায় আসা করদাতাদের সংখ্যা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কর প্রদানের পরিবেশ সুন্দর এবং ভোগান্তিমুক্ত হতে হবে, যা অধিকাংশ সময়ে করদাতারা সরকারি কর অফিসে গিয়ে পাচ্ছেন না। কিন্তু মেলায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে মানুষ যথাযথ সেবা পাচ্ছেন। এ কারণেই হয়তো কর অফিসে না গিয়ে আয়কর মেলায় এসে ভিড় করছেন তারা। মেলার পরিবেশ যদি বিভিন্ন কর অঞ্চলের অফিসগুলোতে বজায় রাখা সম্ভব হয়, করদাতারা তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেখানেও যাবেন। মানুষের মন থেকে ভীতি দূর করতে পারলে আয়কর প্রদানে আরো অধিক সংখ্যক মানুষ আগ্রহী হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আয়কর মেলায় আগ্রহীদের ভিড় বলে দেয়, দেশে আয়কর দিতে উত্সাহী মানুষের সংখ্যা কম নয়। আয়কর দাতাদের কিছু কিছু সুবিধা দিয়েও কর প্রদানে উত্সাহী করে তোলা যায়। অধিক সংখ্যক মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এনবিআর। কাজেই করদাতাদের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে সুবিধা পেলে আরো অধিক সংখ্যক মানুষ কর দিতে আগ্রহী হবে আশা করা যায়।
এটি খুব স্পষ্ট যে, বিপুল সংখ্যক মানুষের হাতে প্রচুর অর্থবিত্ত রয়েছে। কিন্তু তারা সঠিকভাবে আয়কর পরিশোধ করছেন না। তারা নানাভাবে কর ফাঁকির ধান্দায় থাকেন। বর্তমান সরকার অবশ্য কর ফাঁকি ও সক্ষম ব্যক্তিদের কর দিতে বাধ্য করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কর ফাঁকি ও সক্ষম ব্যক্তিদের কর দিতে বাধ্য করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে কর দিতে সক্ষম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন এর বড় উত্স নাগরিকের প্রদত্ত কর। সময়মতো কর পরিশোধের মাধ্যমে আমাদের উচিত উন্নয়নের অগ্রযাত্রা সচল রাখা।