অতি মূল্যায়ন রুখতে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ

 
পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম যেন অতি মূল্যায়িত হতে না পরে সেজন্য বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক মাস ধরে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন। এতে শেয়ার কেনার চাহিদা বেড়েছে। দিন দিন বাড়ছে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক। তবে এখনো পুঁজিবাজারে অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলক নীচে রয়েছে। তাই এখনই শঙ্কা তৈরি না হলেও নতুন বিনিয়োগকারীরা যেভাবে আসতে শুরু করেছেন তাতে আগেভাগেই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
 
২০১০ সালের মতো এবার শেয়ারের দাম যেন অতিমূল্যায়িত হতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ইতোমধ্যে বিএসইসির পক্ষ থেকে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে নতুন নতুন কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বলছে, গত বছরের মাঝামাঝি রোড শো করেও কয়েকটি কোম্পানি এখনো বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। এরমধ্যে এসটিএস হোল্ডিংস, আমরা নেটওয়ার্কস এবং ঢাকা রিজেন্সি হোটেল রোড শো করেছে গত বছর এপ্রিলে। বসুন্ধরা পেপার মিলসের রোড শো হয়েছে জুনে। আমান কটনের রোড শো হয়েছে জুলাইয়ে। আর ডেল্টা হসপিটাল, বেঙ্গল পলি, রানার অটোমোবাইলস, ইনডেক্স এগ্রো এবং পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের রোড শো হয়েছে অক্টোবরে। এ কোম্পানিগুলো এখনো তালিকাভুক্ত না হওয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসির কাজের শ্লথতাকেই দায়ী করছেন তারা। তাছাড়া তালিকাভুক্তির এ দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতেও আগ্রহ পায় না। তাই আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য বিএসইসিকেই অগ্রগামী হতে হবে। বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব আইপিও অনুমোদন দেওয়া হবে।
 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ এর পর এ পর্যন্ত অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে বাজারে শেয়ারের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে যেভাবে নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে আসছে তাতে সতর্ক থাকতে হবে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনও বাজারে দ্রুত সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়া বাধ্যতামূলক করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
 
এদিকে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেয়ারবাজারে সরকারি বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণেই বিষয়টি ঝুলে আছে। সম্প্রতি সরকার আবার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে ভালো সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে গত সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকিং বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। খুব শিগগির আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে শেয়ার ছাড়ার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হতে পারে। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে সরাসরি (ডিরেক্ট লিস্টিং) তালিকাভুক্ত হলে বিক্রিত শেয়ারের অর্থ কোম্পানির তহবিলে না এসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। ফলে কোম্পানিগুলো এ পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। আর সরকারি বেশিরভাগ কোম্পানিই লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে আইপিওর মাধ্যমেও পুঁজিবাজারে আসতে পারে না।
 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কোম্পানি ছাড়া দেশে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে যারা বাজারে শেয়ার ছাড়তে পারে। এ কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার পরও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার বিনিয়োগকারীরা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার দাবি করে আসছেন। বর্তমানে এ ধরনের প্রায় সাড়ে তিনশ’ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থাকলেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে মাত্র ১২টি কোম্পানি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, কোনো বহুজাতিক কোম্পানিই স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারে আসবে না। তাদেরকে আনতে হলে নীতি নির্ধারকদেরকে কার্যকরী পদক্ষেপ রাখতে হবে। এজন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিবন্ধনের সময়ই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির শর্ত থাকা দরকার। আর যারা বর্তমানে নিবন্ধিত রয়েছে তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে। এ উদ্যোগ নিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়কেই।
 
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে নিবন্ধিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন খাতে বছরের পর বছর ধরে বড় অংকের মুনাফা করছে। অথচ বাংলাদেশের শেয়ারহোল্ডাররা তার সুবিধা নিতে পারছেন না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের স্বার্থে এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য কর সংক্রান্ত্র বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিগুলোকে যেখানে ৩৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হয় সেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য করহার ২৫ শতাংশ। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আড়াই শতাংশ কর ছাড় পায়। মোবাইল  কোম্পানি পায় ৫ শতাংশ ছাড়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য এভাবে ছাড় দেওয়ার পরও  কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।