ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ১৫ শিক্ষক!

 
বাগমারা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের কোন তফসিল ঘোষণা হয়নি। পূর্বের ২০০১ সালের নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রায় দেড় যুগ অতিবাহিত হওয়ায় সমিতির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। মাঝে মধ্যে এই সমিতির নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়ে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি ২০১৭ সালে আবার নির্বাচনের আভাস পাওয়া গেলে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ আবারো নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নামেন।
 
সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বাগমারা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে নেতা হওয়ার জন্য কতিপয় শিক্ষক আগাম প্যানেল তৈরি করে তফসিল ঘোষণা ছাড়াই নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েন।
 
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষক সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা স্কুলে গিয়ে কোন রকমে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে দল বেঁধে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সমিতির নির্বাচনের জন্য শিক্ষকদের মধ্যে গণসংযোগ শুরু করেন। তারা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুলে স্কুলে গিয়ে নিজেদের প্যানেলের পক্ষে সিলেকশন প্রার্থনা শুরু করেন। এতে সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা শিক্ষকদের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
 
নতুন বছরে নতুন বই পেয়ে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন। শিক্ষকদের এমন কার্যকলাপের বিষয়টি কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে টনক নড়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার। বিষয়টি চরম উদ্বেগজনক ও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে হুমকি স্বরূপ আখ্যায়িত করে শিক্ষকদের কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়।
 
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা এবিএম ছানোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী। সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে শিক্ষকরা ঢালাও ভাবে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের নামে সম্পূর্ণরূপে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুলে স্কুলে ঘুরে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক এবং সরকারি চাকুরী বিধিমালার পরিপস্থি। তাই শিক্ষকদের এ ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।
 
প্রজ্ঞাপনটি ওই দিনই সকল প্রতিষ্ঠান প্রধান মারফত সকল শিক্ষকদের অবগত করানো হয়। এদিকে ওই প্রজ্ঞাপন জারির চারদিন অতিবাহিত হলেও থামছে না শিক্ষকদের নির্বাচনী প্রচারণার কাজ। শিক্ষক নেতারা ওই নির্দেশ উপেক্ষা করে জোর প্রচারণার কাজ চালিয়ে চাচ্ছেন। তারা স্কুলে পড়ানোর বদলে দিনের অধিকাংশ সময় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকছেন।
 
উপজেলার নখোপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান ও যোগিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাইয়ুম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তাদের বিদ্যালয়ে স্কুল চলাকালীন সময়ে গত শনিবার (২৮ জানুয়ারি) সমিতির নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়টি তুলে ধরে সিলেকশন প্রার্থনা করে শিক্ষকদের সাথে গণসংযোগ করতে আসেন এক দল শিক্ষক।
 
প্রায় একই অভিযোগ করেন গাঙ্গোপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজমুল, নাছরিন সুলতানা ও তাহেরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম হাফিজুর রহমান সহ বেশ কয়েকজন।
 
তাদের অভিযোগ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি মোট ১৫ জন শিক্ষক গত ২৪, ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি স্কুল চলাকালীন সময়ে তাদের স্কুলে গিয়ে সমিতির নির্বাচনে নিজেকে প্রার্থিতার বিষয়টি তুলে ধরে ভোট ছাড়াই তাকে হাত তুলে সভাপতি পদে সিলেকশনের জন্য শিক্ষকদের বলেন। এতে তাদের স্কুলের স্বাভাবিক পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এঘটনায় বিরক্ত হলেও মুখ বুজে বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হন। এ ছাড়া অনেক শিক্ষককে নির্বাচন ছাড়াই সিলেকশন দেওয়ার জন্য হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ করেছেন এই শিক্ষকেরা।
 
সৈয়দপুর শংকরপৈ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন,সিলেকশনে সমর্থন দেওয়ার জন্য এখনই জবরদস্তি শুরু কার হয়েছে। বিষয়টি মেনে না নিলে বদলির হুমকি দেয়া হচ্ছে।
 
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান মটর নিজেকে সমিতির নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী হওয়ার বিষয় স্বীকার করলেও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
 
উপজেলার (ভারপ্রাপ্ত) শিক্ষা কর্মকর্তা এবিএম ছানোয়ার হোসেন বলেন, আমরা এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে আছি। ইতিমধ্যে আমরা অবৈধ প্রচারণা বন্ধে চিঠি ইস্যু করেছি। বিষয়টি নিয়ে সহকর্মীদের (সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা) নিয়ে জরুরি মিটিং আহ্বান করেছি। মিটিংয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
 
 
ইত্তেফাক/আরএ