আজ ছুটির দিন। মেলার দুয়ার সকাল থেকেই খোলা। সকাল এগারটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত এই দু’ঘণ্টা শিশুপ্রহর। তাই আশা করাই যায়, মেলা প্রাঙ্গণ সকাল থেকে ভরে যাবে শিশুদের কলকাকলিতে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনেই মেলায় ফিরে এসেছে চিরচেনা পরিবেশ। সুন্দর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। মাত্রই শুরু হলো মেলা, তাই কিছু অব্যবস্থাপনা রয়েছে। কিন্তু সেসব কোন বাধা হয়নি বইয়ের টানে ছুটে আসা দর্শনার্থীদের। বইয়ের গন্ধ ভালোবাসেন, ভালোবাসেন পড়তে তারা ঠিকই এসেছিলেন মেলায়। বিকালে মেলা ঠিকই জমে উঠেছিল। শিশু-কিশোররা যেমন এসেছে মা-বাবার সঙ্গে, তেমনি তরুণ-তরুণীরাও বইয়ের স্টলে ঘুরে খুঁজে নিয়েছেন প্রিয় লেখকের বই। শীতের আমেজে মেলায় ঘুরেফিরে বেড়ানো, আড্ডা দেবার জন্যেও বেশ সুন্দর খোলামেলা জায়গা। তাই বন্ধুদের দলে দলে আড্ডা জমে উঠেছে মেলার ফাঁকা স্থানগুলোতে। চলেছে বই নিয়ে আলোচনা। কিছু কিছু স্টলের সামনে পাঠকদের ভিড়ও জমে উঠেছিল। নতুন বই ও মোড়কের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল স্টলগুলো।
গতকাল মেলায় এসেছিলেন লেখক আনিসুল হক। প্রথমার স্টলে বসে বইয়ে স্বাক্ষর করে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তিনি বললেন, আমার ধারনা এবার মেলা জমে উঠবে। এ কথা প্রতিবছর বলি। তবে এবার সার্বিক অবস্থা মেলা জমে উঠবার অনুকূলে। এবছর রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত। মেলাও বেশ গোছানো। প্রশস্ত পথ, বিন্যাস ভাল। খুব সুন্দর গোছানো মেলা হয়েছে। পাঠকরা স্বতস্ফূর্তভাবে মেলায় আসবেন এটাই প্রত্যাশা। এবছর আনিসুল হকের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমা প্রকাশন থেকে এসেছে ‘প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে’। শিশুদের জন্য এসেছে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’। এছাড়া তার আরো কয়েকটি বই আসবে মেলায়।
সাহিত্য সম্মেলন:আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বিদেশি কবি-লেখকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কবি-লেখকদের মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন— মেনফ্রেড কোবো (অস্ট্রিয়া), ইওনা বুরঘার্ট ও টোবিয়াস বুরঘার্ট (জার্মানি), লুস মারিয়া লোপেজ ও মারিয়া ডি লোস অ্যানজেলেস কামাকো রিভাস (পুয়ের্তোরিকো), ভিক্টর আলেক্সান্ড্রোভিচ পোগাদাইভ (রাশিয়া), ডং ইউ চেন (চীন) এবং বাংলাদেশের মুহম্মদ নূরুল হুদা, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মিজারুল কায়েস, শামীম আজাদ, আমিনুর রহমান, সুমন রহমান, রশিদ আসকারী। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কায়সার হক। অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিভিন্ন দেশের কবি-লেখকেরা বলেন, ভাষার ভিন্নতা মানব-অনুভবের সর্বজনীন ঐক্যের মাঝে কোনো বিভাজনের দেয়াল তুলতে পারে না। সাহিত্য বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে হূদয়সেতু বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় পর্বে ছিল ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন লেখক সম্মাননা ২০১৭ প্রদান’। বিকালে অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে সম্মাননা প্রদান করা হয়— জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে। সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে জীবনব্যাপী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের পুষ্পস্তবক, সম্মাননাসূচক ক্রেস্ট ও উত্তরীয় অর্পণ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। অসুস্থতার কারণে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অনুপস্থিতিতে তাঁর পুত্র আনন্দ জামান পিতার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন। সম্মাননা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। সম্মাননা প্রদান করে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, এই ছয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের ভাষা-সাহিত্য ও দেশ-জাতির গর্ব। বাংলা একাডেমি একুশের অনুষ্ঠানমালার শুরুতে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে তাঁদের সম্মাননা প্রদান করে এই বিরল গুণীদের কাছে আমাদের সমষ্টিক ঋণ স্বীকার করলো মাত্র।
চীনা ভাষায় রবীন্দ্র রচনাবলী: চীনা ভাষায় প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর মোড়ক উন্মোচন করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। ৩৪ খন্ডের এই রচনাবলীর অনুবাদ করেছেন চীনের বিখ্যাত লেখক ডং ইউ চেন ও তার ১৮ জন সহযোগী। চীনের পিপলস পাবলিশিং হাইজ প্রকাশ করেছে বইটি। বইটির সম্পাদনা বিভাগের পরামর্শক ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, সনত্কুমার চট্টোপাধ্যায়, শামসুজ্জামান খান, করুণাসিন্ধু দাস ও সেলিনা হোসেন। মোড়ক উম্মেচন অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, ভারতের লেখক পবিত্র সরকার, অমর মিত্র প্রমুখ।
চীনা ভাষায় রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রধান সম্পাদক চীনা লেখক ডং ইউ চেন অনুষ্ঠানে বলেন, চাইনিজ ভাষায় রবীন্দ্র রচনাবলীর অনুবাদ করতে পেরে আমি ধন্য। এর মধ্য দিয়ে চীনা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে বলে আমার বিশ্বাস। এর আগে আর কোনো বাংলা সাহিত্যের রচনাবলী এভাবে চীনা ভাষায় কেউ অনুবাদ করেনি।
শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলার পরে এই প্রথম রবীন্দ্র রচনাবলী অন্য কোন ভাষায় পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশিত হলো। এটি আমাদের জন্য বড় পাওয়া। দুই ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির আদান-প্রদানে বইটি গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিদেশি লেখক:গতকাল বইমেলা প্রাঙ্গণ বিদেশি লেখকদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছিল। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স এবার সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেয়া বেশ কয়েকজন কবির কবিতার বই প্রকাশ করেছে। গতকাল সেই লেখকরা অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সের স্টলে বসে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকেই তাদের সঙ্গে সেল্ফি তোলায় মেতে ওঠে। যারা অ্যাডর্নের স্টলে পাঠকের মুখোমুখি হন তারা হলেন - মেনফ্রেড কোবো (অস্ট্রিয়া), ফার্নান্দো রেন্ডন (কলম্বিয়া), টবিয়াস বুরঘার্ট (জার্মানি), ইওনা বুরঘার্ট (আর্জেন্টিনা/জার্মানি), ভিক্টর পোগাদাইভ (রাশিয়া), লুস মারিয়া লোপেজ (পুয়ের্তোরিকো) ও মারিয়া দে লো অ্যানজেলেস কামাকো রিভাস (পুয়ের্তোরিকো)।
নতুন বই:গতকালও মেলায় এসেছে শতাধিক নতুন বই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— সেলিনা হোসেনের ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান’, চন্দ্রাবতী একাডেমি; আয়েশা ফয়েজের ‘শেষ চিঠি’, তাম্রলিপি; মোহাম্মদ রফিকের ‘মানব পদাবলি’, বাতিঘর; এ কে এম শাহনেওয়াজের ‘ভাষা আন্দোলন পরিপ্রেক্ষিত ও ইতিহাস’, অবসর; সাদ উর রহমানের ‘ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি’, ঐতিহ্য; নবনিতা বসু হকের ‘ভারতীয় সেরা লেখিকাদের সেরা গল্প’, অনিন্দ্য প্রকাশ; হুমায়ূন আহমেদের রচনাবলী- নবম ও দশম খন্ড’, অন্যপ্রকাশ; হরিশংকর জলদাসের ‘জীবনানন্দ ও তাঁর কাল’, অবসর।
মেলামঞ্চের আয়োজন:গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চ অনুষ্ঠিত হয় বাংলা ‘কথাসাহিত্য’ শীর্ষক সেমিনার। এতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্য বিষয়ে তিনটি পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যথাক্রমে অধ্যাপক বিশ্বজিত্ ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী এবং অমর মিত্র। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পারভেজ হোসেন, কবি আনিসুল হক এবং জাকির তালুকদার। সভাপতিত্ব করেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক।
পরে মেলা মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা ভাষার স্বরচিত কবিতা পাঠ’ পর্ব। এই পর্বে কবিতাপাঠে অংশ নেন বাংলাদেশ ও ভারতের কবিবৃন্দ। সভাপতিত্ব করেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।