অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নেয় ভাষা আন্দোলন

 
ভাষা মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। অর্থনৈতিক বিকাশের কারণে সমাজে বসবাসরত মানুষের মাঝে নানা রকম টানাপড়েন চলে, মনোজগতে তার প্রভাব পড়ে। পণ্য উত্পাদন বৃদ্ধি ও ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণিবিভেদ সৃষ্টি হয়। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। যারা বঞ্চিত হতে থাকে তাদের মাঝে সৃষ্টি হয় হতাশার। তখন নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যনির্ভর আচার অনুষ্ঠানের মাঝে আবেগের বিকল্প খুঁজতে থাকে মানুষ। নিরাপত্তাহীনতা বোধে ভুগে ভাষা বা জাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মানুষ খুঁজতে থাকে তার নিরাপত্তা। ভাষা তখন সুখদুঃখের বাহন হয়ে ওঠে। সেই ভাষার ওপর আঘাত এলে মানুষের মর্যাদায় আঘাত লাগে। ভাষা যেহেতু সবার, তাই মানুষ দল বেঁধে সংগ্রামে নামে ভাষার জন্য, পরস্পরের নিরাপত্তার চৌহদ্দিকে সুদৃঢ় করার জন্য।         তাই বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে কি না, সে প্রশ্নটি নিয়ে যখন বিতর্ক ওঠে, তখন সতর্ক হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলের আপামর জনগণ।
 
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশবিভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের যে রূপ দাঁড়িয়েছিল তাতে নতুন রাষ্ট্রে বাঙালি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মাতৃভাষা বাংলা বিষয়ক বিতর্ক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর অতিদ্রুত রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক বিতর্কের পথ ধরে বিক্ষোভে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম ভাগে সক্রিয় ভাষা-আন্দোলনের পেছনে সচেতনভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেতনা এবং একটি বিশেষ মানবগোষ্ঠী হিসেবে স্বাতন্ত্র্যবোধ কাজ করছিল। এই ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য নিছক ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
 
দেশভাগের ফলে বাংলার মূল কেন্দ্র কলকাতা পূর্ববঙ্গের বাইরে পড়ে। এই অঞ্চল থেকে বহু হিন্দু জমিদার কলকাতায় চলে যায়। অন্যদিকে ভারতের ধনাঢ্য মুসলমানরা চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। ভূমিনির্ভর ধনাঢ্য মুসলমানরা বাস করত পশ্চিম পাকিস্তানেই। মুসলিম লীগের মূল নেতৃত্বেও ছিলেন তারাই। অচিরেই বোঝা গেল, উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে চাকরির ক্ষেত্রে বাঙালিরা পড়বে অসুবিধায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে পূর্ব বাংলায় সরকারি চাকরিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিপত্য ছিল। দেশবিভাগের পর অধিকাংশ হিন্দু কর্মকর্তা-কর্মচারী চলে যায় ভারতে। সে সময় ইংরেজ আধিপত্যেরও অবসান হয়। কিন্তু দেশবিভাগ কার্যকর হওয়ার পর শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, চাকরির ক্ষেত্রেও উর্দুুভাষীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা বাঙালিদের চেয়ে উন্নততর, এ রকম মনোভাব তাদের আচরণে প্রকাশ পায়। স্বভাবতই চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাঙালি সুবিচার পাবে না এ রকম আশঙ্কা বাঙালি সমাজে ঘনীভূত হয়। তাই ভাষার প্রশ্নটি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে প্রগাঢ় হয়ে দেখা দিয়েছিল।
 
একই সঙ্গে শোষণের পশ্চাত্ভূমি হয়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলা। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষের বাস ছিল পূর্ব বাংলায়। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানবগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালি ৫৪.৬ শতাংশ, পাঞ্জাবি ২৮.৪ শতাংশ, উর্দুভাষী ৭.২ শতাংশ। বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল অভ্রান্ত, উর্দু পাকিস্তানের বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভাষা ছিল না।
 
পাকিস্তানের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষাই ছিল সবচেয়ে উন্নত। এসব ছিল বাংলা ভাষার সপক্ষে বড় যুক্তি। স্বভাবতই পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এ অঞ্চলের উন্নয়নে সচেষ্ট হবে পাকিস্তানি শাসকরা। কিন্তু সেটা হয়নি। পাকিস্তানের রাজধানী হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস আদালত সবই পশ্চিমাঞ্চল ঘিরেই বেড়ে উঠল। শিল্পায়ন, আমদানি, বিদেশি সাহায্য কেন্দ্রীভূত হলো পশ্চিমে। পূর্ব বাংলা যে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হয়ে উঠছে, সে বোধও ক্রমেই জোরদার হয়েছিল এ অঞ্চলের মানুষের মনে। তাই ভাষা আন্দোলন হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অস্তিত্বের লড়াই, হয়ে উঠেছিল অধিকার আদায়ের আন্দোলন।