মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় এক কাপড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে চলছে চরম খাদ্য সংকট। বিশেষ করে স্বামী সন্তানহারা সংসারের হাল ধরার মতো কেউ না থাকায় তাদেরকে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
বুভুক্ষ ছেলেমেয়েদের কান্না সইতে না পেরে লোকলজ্জা ত্যাগ করে অনেক ভদ্র ঘরের রোহিঙ্গা বিধবা নারীরা কিছু পাওয়ার আশায় সড়কের আশেপাশে বসে দিন কাটাচ্ছে। গতকাল শনিবার কুতুপালং বস্তি এলাকা ঘুরে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের কুতুপালং বুড়িরঢালা রাস্তার পাশে অপেক্ষমান, মুখে কাপড় বাঁধা রোহিঙ্গা নারী রেজিয়া খাতুনের (২৩) সাথে কথা হয়। তিনি জানান, তার বাড়ি মিয়ানমারের মংডু গৌজবিল গ্রামে। তার জমিজমা, সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল সবই ছিল। তার সুখের সংসারে মিয়ানমার সেনারা আগুন দিয়ে ছারখার করে দিয়েছে।
তিনি আরো জানান, তার স্বামী মোহাম্মদ ছিদ্দিক (৩২) কে চোখের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে তাকে ধর্ষণ করেছে। কাঠের তৈরি বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। হুমকি দিয়ে গেছে পরদিন দেখলে দু’ছেলে মেয়েসহ তাকেও মেরে ফেলা হবে। ওই রাতেই তিনি পাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কুতুপালংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৩ দিন ৩ রাত অনাহারে অর্ধাহারে, অনাহারে পাহাড় জঙ্গল, খালবিল, নদী নালা পেরিয়ে তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি জানান, হাতে যে ‘টি টাকা কড়ি ছিল তা দিয়ে কোনরকম একটি ঝুঁপড়ি তৈরি করেছেন। কিন্তু আহার জোগাবার মতো কেউ না থাকায় আজ তাকে পথে বসে ভিক্ষা করতে হচ্ছে।
পাশেই বসা চল্লিশোর্ধ রোহিঙ্গা মহিলা হালিমা খাতুন জানায়, স্বামী আব্দুল্লাহ (৬০) মারা যাওয়ার পর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সে মংডু খেয়ারিপ্রাং গ্রামে মোটামুটি ভাবে সুখেই ছিলেন। এক রাতে মিয়ানমার সেনা ও রাখাইন যুবকেরা তার বাড়ীতে হামলা চালায়। এ সময় সেনারা তার মেয়ে কুলসুমা (১৮) কে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাঁধা দিতে গেলে বড় ছেলে উমর আলীকে বর্মী সেনারা গুলি করে হত্যা করে। পরে কুলসুমাকে বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য উপর্যুপুরি ধর্ষণ করে তাকেও কুপিয়ে হত্যা করে। চোখের সামনে ছেলে মেয়ে হারানোর এ দৃশ্য এখনো ভুলতে পারছিনা। প্রাণ বাঁচাতে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছি আজ একমাস ধরে। কিন্তু কোন ত্রাণসামগ্রী পায়নি। শুনেছি কেউ চাল পাচ্ছে। কিন্তু আমাকে এ পর্যন্ত কেউ এক কেজি চাল দেয়নি। বাধ্য হয়ে রাস্তায় বসেছি ভিক্ষা করতে। এভাবে বেশ কয়েকজন বিধবা নারী তাদের অভাব অনটনের কথা জানালেন।
আইওএম ফিল্ড কোর্ডিনেটর হাসান মাহামুদ জানান, তারা এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার পরিবার পিছু ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছেন। একই কথা বললেন, ডব্লিউএফফি’র একজন কর্মকর্তা সৈকত বিশ্বাস। তিনি জানান, রোহিঙ্গা নেতাদের তালিকা অনুযায়ী তারা চাল দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, এখানে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা এসেছে। এদের মধ্যে প্রথম দিকে যারা এসেছে তাদের তালিকা করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিচ্ছিন্ন ভাবে যেসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে তারা তালিকার বাইরে থাকায় অনেকেই ত্রাণ সামগ্রী পায়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রোহিঙ্গা বস্তিতে খাদ্য সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, তাকে প্রতিদিন অসংখ্য রোহিঙ্গা লোকজনকে চাল খাবারসহ বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী মানবিক কারণে দিতে হচ্ছে।
ইত্তেফাক/এএন