পৌর মেয়রের গুলিতেই সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর শটগানের গুলিতেই সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের মৃত্যু হয়েছে। এমন দাবি করেছেন স্থানীয় এমপি  হাসিবুর রহমান স্বপন ও  জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত। গত বৃহস্পতিবার শহরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হন দৈনিক সমকালের উপজেলা প্রতিনিধি শিমুল। পরদিন শুক্রবার গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় আনার পথে তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর খবর শুনে সেদিন শিমুলের নানিও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

দুই দফা জানাজা শেষে গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিক শিমুল ও তার নানি রোকেয়া বেগমকে স্থানীয় মাদলা গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে শাহজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রথম এবং পৌনে ১২টার দিকে মাদলার কাকিলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে।

এদিকে শিমুল হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি হিসেবে পুলিশ আরও পাঁচজনকে আটক করেছে। এরা হলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পৌর শহরের ছয়আনি পাড়ার কে এম নাসির উদ্দীন, বাড়াবিল গ্রামের মো. আরসাদ আলী, নাজমুল হোসেন, আলমগীর হোসেন ও জহির উদ্দীন। এর আগে মেয়রের দুই ভাইসহ এ পর্যন্ত এ ঘটনায় মোট সাতজনকে গ্রেফতার করা হলো। এ বিষয়ে শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল হক জানান, আটকদের মধ্যে চারজন এজাহারভুক্ত আসামি। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান চলছে।

এমপি ও অতিরিক্ত এসপি যা বললেন: শাহজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজার আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘সংঘর্ষের সময় পৌর মেয়র হালিমুল হক নিজে তার শটগান দিয়ে গুলি করেন। এই গুলিতেই সাংবাদিক শিমুল গুলিবিদ্ধ হন ও পরে মারা যান। তিনি বলেন, শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোনো দ্বন্দ্ব বা বিভেদ নেই। মেয়র নিজে ও তার দুই ভাই এবং তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী পৌর শহরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আমরা এ ঘটনার জন্য মেয়রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

শাহজাদপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত বলেন, ‘সংঘর্ষের সময় পৌর মেয়র যখন তার শটগান বের করে গুলি ছুড়তে উদ্যত হন। তখন আমরা বার-বার নিষেধ করি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। তার গুলিতেই সংবাদ সংগ্রহে থাকা সাংবাদিক শিমুল আহত হয়ে মারা গেছেন। আমরা গুলির খোসাসহ শটগানটি উদ্ধার করেছি। তবে পালিয়ে যাওয়ায় পৌর মেয়রকে আটক করা যায়নি।’

পুলিশের সহযোগিতায় মেয়র পালিয়েছে এমন অভিযোগ তুলে এমপি স্বপন সাংবাদিকদের জানান, এর আগেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ করায় ২ দফা বহিষ্কার হয়েছিলেন মেয়র মিরু। জানাজার  আগে আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ রহমান, ইউএনও আলীমুন রাজীব, সমকালের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক তপন দাস, কেন্দ্রীয় যুবলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাজ্জাদ হায়দার, সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফজল-এ-খোদা লিটন, শিমুলের ছোট ভাই মো. আজাদ হোসেন প্রমুখ।

স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল: সাংবাদিক শিমুল হত্যার প্রতিবাদে শাহজাদপুর পৌরশহরে গতকাল ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। শহরে সকল প্রকার দোকানপাট, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। হরতালের সমর্থনে শহরের মোড়ে-মোড়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দোষীদের আটকের দাবিতে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেন মাদলা গ্রামবাসী। সাংবাদিকরাও একইভাবে কর্মসূচি পালন করেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিভিন্ন স্থানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন: এদিকে জানাজা ও হরতাল কর্মসূচিতে অংশ নেয়া সিরাজগঞ্জের সিনিয়র সাংবাদিক ফেরদৌস রবিন, হারুনর রশিদ খান হাসান, ফেরদৌস হাসান, এনামুল হক খোকন, আরিফুল গণি লিমন প্রমুখ জানান, আমাদের নিরাপরাধ এক ভাই সাংবাদিকতার মাঠে মেয়র মিরুর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। আমরা বসে থাকতে পারি না। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি শিমুলের খুনিরা যেন রাজনৈতিক আশ্রয় না পায়। অসহায় পরিবারটিকেও যেন তিনি দেখভালের দায়িত্ব নেন।

নিহত সাংবাদিক শিমুলের বাড়ি শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের মাদলা গ্রামে। তার দুটি সন্তান রয়েছে। ছেলে আল নোমান সাদিকী (১১) ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এবং মেয়ে তামান্না খাতুন (৭) নার্সারিতে লেখাপড়া করছে। তার স্ত্রী নুরুননাহার বেগম পেশায় গৃহিণী। মাত্র ৬ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর নানি রোকেয়া বেগমের কাছেই শিমুল মানুষ হন।

যেভাবে মারা গেলেন শিমুল: গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়র হালিমুল হক মিরুর ছোট ভাই হাফিজুল হক পৌর শহরের কালীবাড়ি মোড়ে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মারধর করেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিজয়ের সমর্থক, কলেজ ছাত্ররা ও তার মহল্লার লোকজন একযোগে বেলা তিনটার দিকে মেয়রের বাসায় হামলা চালায়। এ সময় মেয়রের বাসা থেকে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আব্দুল হাকিম শিমুলের মাথা ও মুখে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে প্রথমে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে অবস্থার অবনতি হলে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শুক্রবার বগুড়া থেকে ঢাকায় আনার পথে দুপুর ১টার দিকে সিরাজগঞ্জে তিনি মারা যান। রাতে নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী নুরুননাহার বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় মেয়র মিরু ও তার আটক দুই ভাইসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত মেয়র হালিমুল হক মিরুকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

শিমুলের মস্তিষ্কে গুলি পাওয়া গেছে:শিমুলের ময়নাতদন্ত গত শুক্রবার রাতে সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তে হাকিমের মস্তিষ্কের মধ্যে একটি গুলি পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন শেখ মনজুর রহমান বলেন, ‘তিন সদস্যের একটি ময়নাতদন্ত টিম শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। এ সময় সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। এ সময় হাকিমের মাথা থেকে একটি গুলি বের করা হয়।’

মানববন্ধন: সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে খুলনা, বগুড়া, রাঙ্গামাটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকরা। খুলনা অফিস জানায়, বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে সমকাল সুহূদ সমাবেশ খুলনা শাখা মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে বক্তারা অবিলম্বে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আব্দুল হাকিম শিমুলের হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগের পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। একই সঙ্গে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিষয়ে দায়িত্বশীল মন্তব্য প্রদান এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান।

ইত্তেফাক/এসএসএ