মীর আব্দুল আলীম
রাজধানী ঢাকায় ভবন নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রে আইন মানা হয় না, থাকে না অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা। থাকে না বিকল্প সিঁড়িও। আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। যদিও সমপ্রতি ফায়ার সার্ভিসে অনেক নতুন সাজ-সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে, তথাপি তা এখনও অপ্রতুল। বিএসইসি ভবন ও বসুন্ধরা সিটিতে যখন আগুন লাগে, তখন আমরা ছিলাম এক প্রকার অসহায়। এখন ২০ তলা পর্যন্ত পানি ও কর্মী বহন করার মতো ক্রেন রয়েছে আমাদের। সেই ক্রেনের ব্যবহার আমরা গত ২৮ মার্চ বনানীতে অগ্নিকাণ্ডের সময় লক্ষ করেছি। বনানীর যে বহুতল ভবনটিতে আগুন লাগে সেখানে অভ্যন্তরীণভাবে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না বিকল্প সিঁড়িও। ভবনটির অনুমোদন ছিল ১৮ তলার, অথচ নকশা না মেনে করা হয় ২৩ তলা। ২৩ তলায় আগুন নেভানোর মতো যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাব রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। ফলে বনানীর অগ্নিকাণ্ডে চেষ্টা সত্ত্বেও অনেকের হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়নি।
২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর ৪৩/১ নবাবকাটরায় পাঁচতলা বাড়িতে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় ১২৩ জনকে। আহত হয় কয়েক শ’ মানুষ। আপনজন হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয় অনেক পরিবারকে। মূলত কেমিক্যাল গোডাউনের আগুনেই এখানে অনেকের সব স্বপ্ন ধূলিসাত্ হয়। গোডাউনের অতি দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সম্পদের সাথে মানুষও অঙ্গার হয়। ঘনবসতি এলাকায় যেখানে সেখানে কেমিক্যাল গোডাউন তৈরি করা বিপজ্জনক। এ বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে ফের আগুন লাগে। ফাগুনের আগুনে শতাধিক মানুষ পুড়ে মারা যায়। এই এলাকাটিও কেমিক্যালের গোডাউনে ঠাঁসা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় চার হাজার কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানা রয়েছে। এসব গোডাউন ও কারখানায় বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ থাকায় আবাসিক এলাকার জন্য তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো সরানোর কথা। উচ্চ আদালতেরও নির্দেশ আছে। কিন্তু কে সরাবেন? কে শোনে কার কথা? যারা কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানোর কাজ করবেন তারাতো নগদ নারায়ণ পেয়ে বিলাসী ঘুমে গভীরভাবে আচ্ছন্ন। তাই যা হবার তাই হয়, হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের এত উদাসীনতা কেন? বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ মানুষের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ভবনে অগ্নি নিরাপত্তার কিছু বিধিমালা নির্ধারণ করে দিলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই অধিকাংশ ভবনে। ঢাকার বেশিরভাগ বহুতল ভবনে যথাযথ অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কায় থাকেন নগরবাসী। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ সাম্প্রতিক এক জরিপের মাধ্যমে ঢাকার জনবহুল ভবন বিশেষ করে হাসপাতাল, শপিং মল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দুই হাজার ৬১২টি ভবনের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেছে। সেখানে মাত্র ৭৪টি ভবন ছাড়া বাকি সবকটি ভবন, অর্থাত্ দুই হাজার ৫৩৮টি ভবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। ঢাকার অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানীতে কেনাকাটার জন্য বেশ জনপ্রিয় বনানী সুপার মার্কেট। সরেজমিনে গিয়ে জরিপ কমিটি দেখেছে, ভবনটিতে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। প্রতি তলায় একটি করে মাত্র ফায়ার এক্সটিংগুইশার। তাও সেটা একেক তলায় একেক স্থানে রাখা হয়েছে। যেটা অনেক সময় চোখেই পড়ে না। এই যদি হয় অভিজাত এলাকার হাল তাহলে অন্যখানের কী অবস্থা?
অগ্নিদুর্ঘটনার হাত থেকে নিরাপদ থাকার কার্যকর ব্যবস্থার নাম ফায়ার হাইড্রেন্ট। বিশ্বের প্রায় সব শহরে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত এই ঢাকা নগরীতে আজও ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। নিমতলী এবং চকবাজারের ঘটনায় দেখা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সরু অলিগলি পেরিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারলেও প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের অভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। ফলে আগুনের ব্যাপ্তি আর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ আগুন লাগলে মানুষ যাতে বেরিয়ে আসতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং এক ভবন থেকে আরেক ভবনের প্রয়োজনীয় দূরত্ব রক্ষা করা জরুরি। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বলতে লোকজন সাধারণত বোঝেন ভবনে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকা। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। বহুতল ভবনে আগুন নির্বাপণ ও জরুরি নির্গমনে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি। এগুলো হলো-রাইজার স্থাপন, স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিং কলার, আন্ডারগ্রাউন্ড পানির রিজার্ভ, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, স্মোক ও হিট ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন ও ফায়ার লিফট নির্মাণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের অল্প কিছু ভবনেই এ নিয়ম মানা হয়। ফলে নিয়মিত বিরতিতেই অগ্নিকাণ্ডে হতাহত ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।
অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও তা মানছেন না সিংহভাগ ভবন মালিক। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারা ও অর্থদণ্ডসহ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তির বিধানও রয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এ আইন প্রয়োগের নিয়ম আছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এই আইনের প্রয়োগ নেই। নামমাত্র অনুমোদন নিয়ে বা না নিয়েই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, মার্কেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অনিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে নিয়ম না মানা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবন থেকে জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা আরো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এসব অসঙ্গতি দূর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
n লেখক : গবেষক