জাটকা বিরোধী অভিযানের মুখে দক্ষিণাঞ্চলের মত্স্য শিকারীরা নদ-নদীগুলোতে পোনামাছ ধরার মহোত্সবে মেতে উঠেছে। পোনামাছ মারার জাল হিসেবে পরিচিত বেহেন্দি ও মশারি জাল দিয়ে জাটকার চেয়েও ছোট সাইজের ইলিশ, রিঠা, আইর, পাঙ্গাস, কাচকি, চাপেলি, চাপিদা, ভাটা, বায়লা, পুঁটি, বাইন ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নির্বিচারে শিকার করছে। এ সব মাছ কোনটা কোন জাতের তা দেখে চেনা মুশকিল। অধিকাংশই ‘গুড়া মাছ’ হিসাবে কেজি দরে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। একটু বড়গুলো নানা প্রজাতির হলেও তা মিলিয়ে ‘সাচরা মাছ’ হিসাবে ভাগা দিয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব সুস্বাদু মাছ বড় হওয়ার আগেই জেলেরা নির্বিচারে শিকার করায় গত এক দশক ধরে ক্রমেই এসব মাছের বংশবিস্তার কমে যাচ্ছে। এমনকি মশারি জাল টেনে ‘গুড়া মাছ’ ধরার পর নদীর তীরে যে কাদা ও পলিমাটিতে এনে ফেলা হয় তাতেও হরেক প্রজাতির মাছের ডিম ধ্বংস হচ্ছে। যেভাবে রেণুপোনা পর্যন্ত শিকার করা হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এখানকার নদ-নদীর সুস্বাদু মাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে সরকারি বিএম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মতিয়ার রহমান জানান। তিনি প্রায় অর্ধশত প্রজাতির মাছ উপকূলের নদ-নদী থেকে হারিয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়ে বলেন, মত্স্য আইনে ৩০ সেন্টিমিটারের নিচে কোনো মাছ ধরা যাবে না। কিন্তু এ আইনটি শুধু ইলিশ শিকারের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে। বাকি যেসব প্রজাতির মাছ শিকার হচ্ছে সেদিকে কারো দৃষ্টি নেই। মত্স্য বিশেজ্ঞরা মনে করেন ছোট মাছ নির্বিচারে শিকার হওয়ার কারণেই মৌসুমী মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।
নগরীর তালতলী পাইকারি ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, সূর্য উঠার আগেই প্রায় অর্ধশত নৌকাবোঝাই গুড়া মাছ নিয়ে হাজির হয়েছে জেলেরা। সারা বছরই এ বাজারে সবধরনের মাছ পাইকারি দরে বিক্রি হয়। ‘গুড়া মাছ’ নাম দিয়ে নানা প্রজাতির লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে।
তালতলী খেয়াঘাট ছাড়াও বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, চরমোনাই, চন্দ্রমোহন, বুখাইনগর ও নলচর এলাকার ঘাটগুলোতে প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার পূর্বেই পাইকারদের কাছে জেলেরা এ ধরনের মাছ বিক্রি করছে। সেখান থেকেই পাইকাররা স্থানীয় বাজার ও নগরীতে এনে এসব মাছ বিক্রি করছে। জেলেরা জানায়, উপকূলের নদ-নদীতে শীত মৌসুমে সাধারণত চাপেলি, কাচকি ও দগরি মাছ ধরার জন্য তারা নামে। কিন্তু এসব মাছের সাথে অবাদে বেহেন্দি জাল, মশারি জাল দিয়ে নির্বিচারে হচ্ছে নানা প্রজাতির মাছের পোনা। এখানকার মেঘনা, তেতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, বলেশ্বর, জয়ন্তী, নয়া-ভাংগুলী, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, কালাবদর, কীর্তনখোলা , কারাখানা ও বুড়া গৌরগঙ্গা নদীতে প্রতিনিয়ত জেলেরা এসব ছোট মাছ শিকারে নামে।
প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, আগে নদীর মাছ ছাড়াও শীতের মৌসুমে এ অঞ্চলের পুকুর ডোবা, নালা, খাল -বিলে শীত মৌসুমে শিং, মাগুর, কই, শৌল, বাছা, পুঁটি ও ভেদি মাছ পাওয়া যেত। নদ-নদীতে কাজলি, রানি, বাইন, পাটা বাইন, মহা শৌল, বাঘা আইড়, বোয়াল, রিটা, পিপলা, চিতলসহ কয়েকশ প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেতো। ধীরে ধীরে এসব প্রজাতির অধিকাংশ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিং ও মাগুরসহ কিছু মাছ আগে পাওয়া গেলেও এখন তাও মিলছে না।
জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান জানান, উপকুলের নদ-নদীতে সাড়ে চার সেন্টিমিটারের জাল দিয়ে মাছ শিকারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর চেয়ে ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে চিংড়িসহ যে কোনো ধরনের মাছের পোনা শিকার করলে মত্স্য আইনে এক থেকে ছয় মাসের জেল এক হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ আইনে সকল মাছ শিকার বন্ধ রাখার জন্য কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু