শিল্পচর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা ও কয়েক প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন সৃষ্টির লক্ষ্যে চারুকলা উত্সবে অংশ নিয়েছেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পীসহ তরুণ শিল্পীদল। তাদের সঙ্গী হয়েছেন গাজীপুর জেলার বিশটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গাজীপুর শালবনের ভেতরে নিসর্গের ছোঁয়ামাখা বিদ্যালয়টি গত চার দিন ধরেই ছিল এমন রঙিন। মাঠ জুড়ে বসেছিল বরেণ্য চিত্রশিল্পী থেকে স্কুলশিক্ষার্থী শিশুদের মিলনমেলা। তারা সবাই মিলে ২৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া চার দিনের আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়ে এঁকেছে অনেকগুলো ছবি। খুদে শিল্পীরা এঁকেছে, প্রখ্যাত চিত্রকররা দেখেছেন শিশুদের রঙের ব্যবহার ও আঁকাআঁকির কৌশল। ছোট ও বড় শিল্পীদের আঁকা এসব চিত্রকর্ম প্রদর্শনীসহ সোমবার শুরু হয় গাজীপুর চারুকলা উত্সব। ২০১৬ সালে জয়পুরহাটে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় উত্সবটি। আগামী বছর নীলফামারীতে তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হবে এ উত্সব। উত্সবের আয়োজক চারুকলা উত্সব গাজীপুর উদ্যাপন পরিষদ।
চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর পাশাপাশি উত্সবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ১৫টি স্থাপনাশিল্প। স্থানীয় সরঞ্জামের ব্যবহারে শিল্পীরা তুলে ধরেছেন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দৃশ্যকল্প। শুভ সাহা ও ইমরান সোহেলের যৌথ স্থাপনা শিল্পে বিবৃত হয়েছে ইটের ভাটার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের চিত্রপট। রঞ্জিত কর্মকারের ‘ইট শ্রমিকের উপাখ্যান’ শিরোনামের স্থাপনা শিল্পে উঠে এসেছে ইটের ভাটায় কর্মরত শ্রমিকের শারীরিক সমস্যা। ইটের স্তূপের মধ্যে একটি কয়লা খণ্ডকে উপজীব্য করে ইট শ্রমিকের দুর্দশার প্রতিচ্ছবি মেলে ধরেছেন শিল্পী।
শনিবার বিকালে উত্সবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার বেগম শামসুন্নাহার, ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি খুরশিদ আলম, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট দিলরুবা হায়দার এবং জাইকার প্রোগ্রাম ম্যানেজার আনিসুজ্জামান চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোহসীন। সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। স্কুল শিক্ষার্থীরা ‘এসো হে’ গানের সুরে নৃত্য ও সম্মিলিত কণ্ঠে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি গেয়ে শোনান। সমাপনী আয়োজনের শেষে একক সংগীত পরিবেশন করেন চিত্র ও কণ্ঠশিল্পী জাহাঙ্গীর আলম ও ব্যান্ডদল সর্বনাম।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কথা হয় উত্সবের কিউরেটর হারুন-অর-রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, শিল্পচর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিমনস্ক মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা ও কয়েক প্রজন্মের শিল্পীর মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এ আয়োজন। অবাধে বৃক্ষনিধন, অপরিকল্পিত কল-কারখানা, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও অসচেতনতার কারণে বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে শালবনের পরিবেশ। এ উত্সবের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মনের গভীরে পরিবেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলাও এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
আর্ট ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, দেশবরেণ্য শিল্পীরা ছবি আঁকছেন। অপর প্রান্তে তরুণ ও খুদে শিক্ষার্থীরা সাদা ক্যানভাসের রঙের আঁচড়ে তুলে ধরছে মনের ভাবনা। তবে এক বিন্দুতে মিলে গেল তাদের ভাবনা। সেটি হলো—রক্ষা করতে হবে গাজীপুরের ভাওয়াল শালবন তথা প্রকৃতিকে। উল্লেখ্য, ১৯ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হবে একই প্রদর্শনী।
বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের মধ্যে আর্ট ক্যাম্পে অংশ নেন শিল্পী রফিকুন নবী, হামিদুজ্জামান খান, সৈয়দ আবুল বারক্ আলভী, আব্দুস শাকুর শাহ, ফরিদা জামান, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস, শেখ আফজাল, আফজাল হোসেন, মোস্তাফিজুল হক, সামসুদ্দোহা, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ ইকবাল, সামিনা নাফিজ, অনুপম হুদা, জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক-ছাত্র ও মুক্ত শিল্পচর্চারত শতজন তরুণ শিল্পীও এ আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন। তবে চমক হিসেবে ছিল গাজীপুরের বিশটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০০ জন শিক্ষার্থীর চারুকলা উত্সবে অংশগ্রহণ। এদের মধ্যে ১শ শিক্ষার্থীই ভাওয়াল মির্জাপুর হাজী জমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের। সব মিলিয়ে সাড়ে তিনশ শিল্পীর তিনশতাধিক চিত্রকর্ম এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।