জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ের গল্প

বন কাটা ছেড়ে পুতুল বানাচ্ছে চকরিয়ার মেয়েরা

গাছ কাটা, বন ধ্বংস বন্ধ করে ওরা এখন রপ্তানি পণ্য তৈরি করে। শিখেছে নিজের হাতে পুতুল তৈরির কৌশল। বেড়েছে নিশ্চিত উপার্জন। এতে একদিকে যেমন নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে, অন্যদিকে রক্ষা পেয়েছে বন সম্পদ, বন্ধ হয়েছে কাঠ কাটা আর ফিরে পেয়েছে নির্মল পরিবেশ ও কৃষি জমি। এটা কোনো গল্প নয়। সমুদ্র বিধৌত কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার মেদাকচ্ছপিয়া এলাকার ঘটনা। নীরবে সেখানে চলছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সারথী হয়ে পথ দেখিয়েছে বন বিভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসআইডি, অংশীদার উইনরক ইন্টারন্যাশনাল আর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘হাতে বুনানো’।

চকরিয়া আর সুন্দরবন, সিলেট ও চট্টগ্রাম দেশের চারটি অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতায়ন করতে সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন বিভাগ বাস্তবায়ন করছে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ রেসিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেম লাইভলিহুড (ক্রেল) প্রকল্প। ২০১২ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্প শেষ হচ্ছে এ বছরই।         ৩৫ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পের সুফল ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, মেদাকচ্ছপিয়ার মহিলারা তেমন কোনো কাজকর্মে অভ্যস্ত ছিলেন না। দিনের বেলায় কাঠ ও গাছ সংগ্রহ করে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু সম্প্রতি তাদের সংগঠিত করে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। প্রকল্পের উপকারভোগী শারমিন আক্তার ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানান, দিনে আমি এখন ১৭টি পুতুল বানাই। আগে বন থেকে ছোট ও মাঝারি গাছ কেটে বিক্রি করতাম। হাতে পেতাম দিনে একশ’ টাকা। এখন আয় দ্বিগুণ হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর বলেন, স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে আমরা বন সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করছি। এই প্রকল্পটি ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এটা একটি টেকসই প্রকল্প। এখানকার তৈরি পুতুল ইতোমধ্যে বিশ্বমান অর্জন করেছে।

‘হাতে বুনানো’ প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়াসহ ৩১টি দেশে রপ্তানি করছে ‘মেদাকচ্ছপিয়ার পুতুল। পাশাপাশি সুমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ বৃদ্ধি, বন ধ্বংসসহ যেসব বিরূপ পরিবেশগত প্রভাব ছিল, এখন এই অঞ্চলে সেগুলো নেই। গত বছর এই এলাকায় চার বার বন্যা হয়েছে। অনেক অঞ্চল তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। মেদাকচ্ছপিয়ার প্রায় ৪০০ হেক্টর সংরক্ষিত বন টিকিয়ে রাখা হয়েছে। স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা গ্রাম পাহারাদার গ্রুপ তৈরি করে গাছ কাটা, গাছ চুরি বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। ফুলজড়ির বন কর্মকর্তা সৈয়দ আবু জাকারিয়া জানান, আমরা পালা করে দিনের বেলায় মহিলা আর রাতে পুরুষদের দিয়ে পুরো বন পাহারা দেওয়া হচ্ছে।

এলাকাবাসী আরো জানালেন, সংরক্ষিত এই বনে হাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারেও কমে আসছিল। কয়েক বছর আগেও মাত্র সাতটি হাতি ছিল। এখন সব মিলিয়ে মেদাকচ্ছপিয়ায় হাতির সংখ্যা ৩৫। এভাবে পুরো এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু