সময় ঠিকই বের করে আনবে তার মহৎ সৃষ্টি: কথাসাহিত্যিক চন্দন আনোয়ার

 
চন্দন আনোয়ার কথাসাহিত্যিক এবং রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ছোটগল্পের কাগজ ‘গল্পকথা’র সম্পাদক। প্রতিশ্রুতিশীল এই কথাশিল্পী দীর্ঘদিন ধরে লিখে যাচ্ছেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের কাগজে। এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর পঞ্চম গল্পগ্রন্থ ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ বের হয়েছে। এছাড়াও কলকাতার বইমেলায় তিরিশটি নির্বাচিত গল্প নিয়ে বের হয়েছে ‘নির্বাচিত ৩০’ নামে একটি গল্পের সংকলন। তাঁর উপন্যাস ‘শাপিতপুরুষ’-এর দ্বিতীয় সংস্করণও এবারের একুশের মেলায় এসেছে। এছাড়া তিনি নিয়মিত গল্পবিষয়ক প্রবন্ধও লিখে থাকেন। তাঁর ‘হাসান আজিজুল হকের কথাসাহিত্য: বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল’ গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত। মেলার শেষবেলায় এসে কথা বললেন দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে। তার সেই সাক্ষাত্কারটি তুলে দেয়া হলো পাঠকদের জন্য।
 
প্রশ্ন : একজন লেখকের চোখে কেমন দেখলেন এবারের বইমেলা?
 
চন্দন আনোয়ার: যেহেতু আমি ঢাকা থেকে বেশ দূরে থাকি এবং দূরত্ব এতো বেশি যে, ইচ্ছে করলেই দিনে দিনে মেলা ঘুরে যেতে পারি না, তাই মাসজুড়ে মেলায় আমি উপস্থিতি থাকি গুটি কয়েক দিন। এবারও সপ্তাহখানেক ছিলাম। যদ্দূর দেখেছি, তাতে এ কথা বলা যায় যে, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের মেলার সার্বিক পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা বেশ সন্তোষজনক। বিশেষত, উদ্যানে লেখক-পাঠকদের স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণের জন্য যথেষ্ট ফাঁকা স্থান থাকায় মেলার মধ্যে তেমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। আমি কেন, যে কোনো লেখকের জন্যই এই বইমেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেভাবেই বলি না কেন, এই বাস্তবতাকে তো আর অস্বীকার করতে পারছি না যে, নব্বই ভাগেরও বেশি বই এই মেলা উপলক্ষেই প্রকাশিত হয় এবং বিক্রি হয়। সারা বছর বই তেমন বিক্রি হয় না। তাই লেখক-প্রকাশক তো বটেই, পাঠকও এই মেলার জন্যেই অপেক্ষা করে। জিজ্ঞাসা বা অভিযোগ বা কারও কারও অভিমানও থাকতে পারে এই মেলাকে ঘিরে, বাংলা একাডেমিকে ঘিরে, কিন্তু আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই তাত্পর্যপূর্ণ মেলার আয়োজন সম্ভব।
 
প্রশ্ন: প্রতিবছর বইমেলার পরিধি বাড়ছে, সেই অনুপাতে পাঠক বাড়ছে বলে মনে করেন কি?
 
চ. আ. পাঠকই যদি না বাড়ে তাহলে মেলার পরিধি বাড়ার তো কারণ নেই। যেভাবেই বলি, পাঠক বেড়েছে, লেখক-প্রকাশ বেড়েছে, তাই মেলার পরিধি বেড়েছে, সরল এই সমীকরণের মধ্যে আর কোনো গরল প্রবেশ করাতে চাই না। যদিও নানা দিকে বেশ কতগুলো বিতর্ক উঠে আসে, কিন্তু এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রকাশকরা কেউ ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন না বা মেলায় স্টল বরাদ্দ নিতে আগ্রহী নন। পাঠকই যদি না বাড়বে তাহলে এতো এতো লেখকের বইগুলো যায় কোথায়? এছাড়া এমন প্রকাশকের কথাও জানি, যারা প্রায় শূন্য থেকে এ ব্যবসায় নেমে এখন বেশ বাড়ি-গাড়ির মালিক। পাঠক নেই, কেবলি বই বের হচ্ছে হাজার হাজার, এ কথার মধ্যে ঠিক আমি যুক্তি খোঁজে পাই না। তবে হ্যাঁ লেখক যেহেতু প্রচুর, তাই পাঠকও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। জনপ্রিয় দু-তিন জন কথাশিল্পী ছাড়া সিরিয়াস ধারার সকলেরই পাঠকসংখ্যা সীমিত। সিরিয়াস ধারার এমন লেখক খুবই কম মিলবে যাদের বই ৩০০ কপির বেশি বিকোয়। অবশ্য, বই বেশি বিক্রির সাথে লেখকের বড়ত্ব বা গৌণত্ব মূল্যায়িত হয় না।
 
প্রশ্ন : এবার যে প্রশ্নটি খুব জোড়েসোড়ে উঠছে তা হলো নতুন বইয়ের কোন মান নেই। এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
 
চ. আ. এই কথাটির মধ্যে একধরনের খামখেয়ালিপনা, উদাসিনতা বা তাচ্ছিল্য বিদ্যমান। ফেসবুকে একজনকে পোস্ট দিতে দেখলাম, তিনি লিখেছেন, চার হাজার বই বের হয়েছে, কিন্তু তিনি বিশটিও ভালো বই পাননি কেনার জন্যে। এখন প্রশ্ন হলো, এ কয়দিনেই তিনি চার হাজার পড়ে ফেলেছেন বা দেখে ফেলেছেন! একটা গড় কথা বলে দিলেন আর কি। অন্ধের হাতি দর্শনের মতো এখন কোনো কিছু না দেখেই বা না বুঝেই একটি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেই। আমি কয়টি বই পড়েছি বা পড়া সম্ভব হয়েছে যে, একবাক্যেই বলে দেব ভালো বই বের হচ্ছে না। আর এই ধরনের মেলায় সব ধরনের বই বের হয়। কারণ, সব ধরনের পাঠকই আসেন। একজন জনপ্রিয় লেখকের কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, অনেক পাঠকই এই লেখকের বই ফ্রিতে দিলেও নেবেন না। কালজয়ী মহত্ সৃষ্টি বা বড় প্রতিভার মহত্ লেখক চিরকালই পরিমাণে অত্যন্ত স্বল্প হয়। অবশ্যই বেশ কিছু ভালো বই এবারের মেলায়ও এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এতো বিপুল পরিমাণের বইয়ের ভেতর থেকে ভালো বইটি কিভাবে সংগ্রহ সম্ভব? এটা একটা সংকটই বটে, এবং এই সংকটে বা দ্বিধায় আমি নিজেও পাঠক হিসেবে বই কিনতে গিয়ে পড়ি। তারপরেও সময় ঠিকই বের করে আনবে তার মহত্ সৃষ্টি।
 
প্রশ্ন: মেলায় বিদেশি লেখক ও পাঠকের আশানুরূপ অংশগ্রহণ নেই কেন?
 
চ. আ. এটা ভাববার বিষয়। কলকাতার বই মেলার মতো অমর একুশে বইমেলাকে আন্তর্জাতিক করা সম্ভব হয়নি। মেলায় বিদেশি লেখক বা পাঠকের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। মেলার প্রথম দিনে বাংলা একাডেমি একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার করেছে বটে, কিন্তু সেই সেমিনারের সাথে মেলার সংযোগ বা বাংলাদেশের লেখক-প্রকাশক-পাঠকের সংযোগ তেমন নেই। এ ব্যাপারে শুধু বাংলা একাডেমি নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর প্রয়োজন।
 
প্রশ্ন: এবারের মেলায় আপনার নতুন কোনো বই এসেছে কি?
 
চ.আ. হ্যাঁ, আমার একটি নতুন গল্পগ্রন্থ এসেছে। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা থেকে ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ নামে গল্পগ্রন্থটি বেরিয়েছে। এটি আমার পঞ্চম গল্পগ্রন্থ। এর বাইরে ‘শাপিতপুরুষ’ উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে।
 
IMG0
 
প্রশ্ন: কলকাতার বইমেলায়ও তো আপনার একটি বই বের হয়েছে?
 
হ্যাঁ, কলকাতার বইমেলায় এবার আমার একটি গল্পের বই বের হয়েছে। আমার লেখা গল্পগুলোর মধ্যে থেকে নির্বাচিত তিরিশটি গল্প নিয়ে ‘নির্বাচিত ৩০’ নামে কলকাতার একুশ শতক প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে বইটি।
 
প্রশ্ন: আপনার ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ গল্পগ্রন্থে কতটি গল্প আছে? গ্রন্থটির গল্পগুলো সাধারণভাবে কি বিষয় নিয়ে লেখা?
 
চ. আ. আমার ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ গ্রন্থটিতে মোট নয়টি গল্প আছে। আমি যে সময় বাস্তবতা, সংকট ও সম্ভাবনার মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছি, আমার লেখায় তাই উঠে আসে তীব্রভাবে। আমি কখনই আমার জিজ্ঞাসা বা ক্রোধ বা প্রতিবাদকে আড়াল করিনি। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, নারীনির্যাতন, রাষ্ট্রেযন্ত্রে স্বেচ্ছাচারিতা বা শক্তির চর্চা, বৈষম্যপীড়িত অবহেলিত অসহায় পরাজিত মানুষের জীবন-সংকটকেই আমি গল্পের বিষয় করেছি।
 
প্রশ্ন: আপনার গল্প লেখার কৌশলটা কি জানতে পারি?
 
চ. আ. এ তো জানানোর কোনো বিষয় নয়। পৃথিবীতে যত গল্পকার আছেন, তাদের প্রত্যেকই নিজ নিজ কৌশলেই লেখেন। আলাদাভাবে কৌশল এঁটে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে আমি গল্প লিখতে বসি না। আমি আমার বিষয় এবং উদ্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করি প্রথমে। অতঃপর গল্পের প্রতিটি বাক্য, এমনকি শব্দ পর্যন্ত লক্ষ্যমুখী। আমার গল্প পড়লে আপনি দেখতে পাবেন, প্রতিটি গল্পেরই আঘাতের লক্ষ্য নির্দিষ্ট। আমার মনে যদি কোনো একটি বিষয় ভীষণভাবে নাড়া দেয়, আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করে তখনি আমি লিখতে বসি।
 
প্রশ্ন: আপনি তো ‘গল্পকথা’ নামে কথাসাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ পত্রিকা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। যে পত্রিকার লেখকসূচি বেশ সমৃদ্ধ ও বিপুল হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান প্রধান লেখক থেকে শুরু করে তরুণ লেখকরা পর্যন্ত লেখেন। আপনার মতে, সাহিত্যপত্রিকা নতুন লেখক তৈরিতে বা পাঠক তৈরিতে কেমন ভূমিকা রাখে?
 
চ. আ. ব্যক্তিউদ্যোগে করা সাহিত্যপত্রিকাগুলোই এখনো সাহিত্যের মৌলিক ও মূলধারাকে টিকিয়ে রেখেছে। দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক সাহিত্যপাতা বা চর্বিকায় ঈদসংখ্যা, যার লক্ষ্যই হচ্ছে বিনিয়োগ, মুনাফা বাণিজ্য আর হালকা মনোরঞ্জন, তার দ্বারা সাহিত্যের বিশেষ কোনো বিকাশ বা চর্চা হয় না। নিতান্ত প্রাণের টানে বা সাহিত্যকে ভালোবেসে বা দায়বদ্ধতা থেকে ব্যক্তিউদ্যোগে করা সাহিত্য পত্রিকাগুলোয় লেখকরা লিখে থাকেন। সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদকের কখনোই সম্মানী দাবি করেন না। এমনকি অনেক লেখক সম্পাদকের কাছে থেকে নিজের কপিটা পর্যন্ত কিনে নেন মানবিকতার কথা ভেবে। এই ধারার পত্রিকায় কিছু বিজ্ঞাপন জুটে বটে, তবে নিতান্তই নগন্য।
 
প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
 
চ. আ. প্রায় বছর দশক আগে ‘শাপিতপুরুষ’ উপন্যাসটি লিখেছিলাম, এবার দ্বিতীয় সংস্করণ এসেছে। এরপর টানা গল্প লিখে গেছি। এখন ভাবছি, গল্প লেখার পাশাপাশি উপন্যাস লেখায়ও মনোযোগ দেব।
 আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।
আপনাকেও। ভালো থাকবেন নিরন্তর।
 
ইত্তেফাক/মণ্ডল