পরিবেশ অধিদফতরকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে স্বরাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়, আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ
হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরে ব্যর্থ হওয়া সব ট্যানারির কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। আদালতের এই আদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৪(৩)ও ৪(ক) ধারা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতরকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. সেলিমের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল সোমবার এই আদেশ দেন। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী ৬ এপ্রিল হাইকোর্টে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছে, সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই প্রেক্ষিতে গত ৩১ জানুয়ারির পর হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া ঢুকতে না দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্ত নেয়া এবং হাইকোর্টের ইতপূর্বের দেয়া রায়ের আলোকে হাজারীবাগে দূষণকারী ট্যানারি পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
আদেশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) মো. আলমগীর ইত্তেফাককে বলেন, হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি পাওয়ার পরই ট্যানারি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
বাংলাএদশ সরকার ১৯৮৬ সাএল ৯০৩টি শ্তিগু কারখানাএক পরিএবশ দূষণকারী হিএসএব চিহিদ্ধত কএর। রৈ মএধঞ্ঝ হাজারীবাএগর চামড়া শ্তিগু-কারখানাপ্পএলা ছিল। শ্তিগু কারখানার পরিবেশ দূষণরোধে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে ১৯৯৪ সালে রিট করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০১ সালে ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের মধ্যে পরিবেশ দূষণরোধে প্রয়োজনীয় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আদালতের এ আদেশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় বেলা প্রয়োজনীয় নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন দাখিল করে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমেদের ডিভিশন ২০০৯ সালের ২৩ জুন এক আদেশ দেন। ওই আদেশে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে হাজারীবাগে অবস্থিত সকল ট্যানারি স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে পরিবেশ অধিদফতরকে ট্যানারি কারখানাগুলো বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময় শিল্প মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য দফায় দফায় আদালতে সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করে। ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর ছয় মাসের জন্য হাইকোর্ট সময় বর্ধিত করে। এরপর শিল্প মন্ত্রণালয় আরো ২ বার অর্থাত্ গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের নির্মাণ সময় বাড়ানোর আবেদন করলে আদালত সময় বাড়ানোর নির্দেশ দেয়নি।
সর্বশেষ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব একতরফাভাবে আদালতের অনুমতি ছাড়া হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের সময়সীমা চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে আবেদন করে বেলা। ওই আবেদনে শিল্প সচিবের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৪ (৩) ও ৪ (ক) ধারা অনুসরণ করে পরিবেশ অধিদফতরকে হাজারীবাগের ট্যানারি বন্ধের নির্দেশনা প্রদানের আবেদন জানানো হয়। গতকাল ওই আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে বেলার পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরে ২০১০ সালের অক্টোবরে ছয় মাস সময় বৃদ্ধি করেছিল হাইকোর্ট। এরপর আর কোনো সময় বাড়ায়নি আদালত। কিন্তু এরপরেও বার বার আদালতের রায় লংঘন করে হাজারীবাগে ট্যানারিগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তিনি বলেন, ৪৩টি ট্যানারি ইতোমধ্যে সাভারে গিয়েছে। এসব ট্যানারি যদি সেখানে যেতে পারে তাহলে বাকিগুলো কেন যেতে পারবে না? এ পর্যায়ে আদালত বলেন, সময় এসেছে এ ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট রইস উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার সাভারে ট্যানারি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। গত ৩১ জানুয়ারির পর কোনো কাঁচা চামড়া হাজারীবাগে যাতে ঢুকতে দেওয়া না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরেও হাজারীবাগে ট্যানারি শিল্প কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ৪৩টি ট্যানারি স্থানান্তরিত হয়েছে। এখনো ১১২টি ট্যানারি সাভারে যায়নি। সকল ট্যানারি না যাওয়ায় পর্যাপ্ত বর্জ্য না হওয়ার কারণে এটি চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই শোধনাগার স্থাপন করতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব ট্যানারি সাভারে যায়নি তারা আদালতের আদেশে দৈনিক দশ হাজার টাকা করে জরিমানা গুণছে। আদালত বলেন, ট্যানারির কারণে বুড়িগঙ্গার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট উপরোক্ত আদেশ দেয়। আদেশে হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ বন্ধে সরকারের বিভিন্ন অধিদফতরের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছে, সে বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়কে আরেকটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
আদেশের পর বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, অবিলম্বে অর্থাত্ একদিনও কালক্ষেপণ না করে ট্যানারি কারখানা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে আদালত একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার আদালতের অনুমতি ছাড়া নিজেই সময়সীমা বাড়িয়েছে। সরকারের এই সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আইন বহির্ভূত। কারণ আদালত যেখানে একটা সময়সীমা বলে দেন, সেখানে সরকার একতরফাভাবে সময়সীমা বাড়াতে পারে না।
ইত্তেফাক/নূহু