ইট ভাঙা নারীদের ভাগ্য বদলের কথা

টুশটাস হাতুড়ির শব্দ, কঠিন ইটের গায়ে আঘাত হেনে চলছে কোমল হাতে ধরে থাকা হাতুড়ি। ইট ভাঙার শব্দ। ইট ভাঙা হচ্ছে রাস্তার পাশে, বাড়ির আঙ্গিনায় বসে। কোথাও আবার ঘরের বারান্দা কিংবা রান্নাঘরের ভেতরেই চলছে ইট ভাঙার কাজ। এটি গৌরীপুর পৌর শহরের বালুয়াপাড়া গ্রামের প্রতিদিনের দৃশ্য।

সংসারের সব কাজ করার পাশাপাশি ইট ভেঙে পরিবারের অভাব দূর করেছেন এই গ্রামের দেড় শতাধিক নারী। উপজেলার বালুয়াপাড়া গ্রামের আব্দুছ সোবহানের মেয়ে রাবেয়া খাতুন ও তার বোন আম্বিয়া খাতুন জানান, আনুমানিক ২৫ বছর আগের কথা। তখন তারা কিশোরী। বাবা রিকশা চালাতেন। সারাদিন খেটে যা রোজগার করতেন তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ হতো না। কিছু একটা করে সংসারের অভাব দূর করার তাড়নায় একদিন ঘর থেকে বের হন। বাড়ি থেকে তিন কি.মি দূরে ছিল উপজেলার রামগোপালপুর জমিদারদের পরিত্যক্ত বাড়ি। সেই বাড়ির খসে পড়া ইট কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। বেশ কিছু ইট ভেঙে সুঁড়কি করে ময়মনসিংহে শম্ভুগঞ্জ এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন। হাতে কিছু টাকা আসে। এভাবে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি থেকে কিছু দিন ইট কুড়িয়ে এনে জমিয়ে মাঝে মাঝে বিক্রি করেন ফেরিওয়ালার কাছে। রাবেয়া আর আম্বিয়ার দেখাদেখি অভাবী আরো কিছু কিশোরী জুটে যায় দলে। মাঝে মাঝে মায়েরাও যান মেয়েদের সঙ্গে। এভাবে চলে পাঁচ বছর। এর মধ্যে বাড়ির আশপাশে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশে গড়ে উঠে কয়েকটি ইটভাটা। বালুয়াপাড়ার নারীরা ইটভাটার কাজে জড়িয়ে পড়ে। ইটভাটায়  ভাঙার অভিজ্ঞাতার কথা মাথায় রেখে এক দিন জমানো কিছু  টাকা দিয়ে বাড়িতে ইট কিনে আনেন আম্বিয়া ও রাবেয়া। সেই ইট বাড়িতে বসে সুঁড়কি করে বিক্রি করেন। ইট বিক্রি করে চার টাকা লাভ হয়। এরপর শুরু হয় নতুন গল্পের। দুই বোন আর মা ইটভাটা থেকে ইট কিনে এনে সুঁড়কি করে বিক্রি করে। দেখাদেখি বালুয়াপাড়ার অভাবী অন্য পরিবারের নারীরাও ইট ভেঙে সুঁড়কি করার কাজ শুরু করে। ২৫ বছর পর এখন ওই এলাকার দেড় শতাধিক নারী দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা ইটা ভাঙার কাজ করেন। আর এতে বদলে গেছে অভাবী মানুষের জীবন।

আম্বিয়া খাতুন বলেন, এই ব্যবসা শুরু করার পর অভাবের সংসারে উন্নতি হয়েছে। স্বামী-সন্তানসহ সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে আমরা এখন সুখি। আমার কারখানায় ১৫/১৬ জন নারী ইট ভাঙার কাজ করেন। নারীদের সঙ্গে আমি নিজে এখনো ইট ভাঙি। পাশাপাশি ব্যবসার আয়ের টাকা দিয়ে অন্য ব্যবসা শুরু করেছি।  ওই এলাকার তাজ্জতুনন্নেছা বলেন, ২০ বছর ইট ভাইঙা সংসারের খাওন যোগাইছি। এখনও সময় পেলে ভাঙি। ইট ভাঙনের কাজে অভাব দূর করছে। যেই এলাকার মানুষ তিন বেলা খাইতে পারতো না, হেরা অহন অনেক সুখে দিন কাডায়।

ইত্তেফাক/নূহু