জালিয়াতি করে সর্বোচ্চ আদলতে গিয়ে ধরা পড়লেন পুলিশের এক কর্মকর্তা ও এক ব্যবসায়ী। প্রথমে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলেও হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ায় ওই দুই প্রতারককে জরিমানা করে ছেড়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে বাড়ির দখল সংক্রান্ত সরকারের আপিল মঞ্জুর করেন আদালত।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। আদেশে গুরুতর জালিয়াতির দায়ে এসপিবিএন-২ তে কর্মরত পুলিশ ইন্সপেক্টর মো. শাহিন ও ওয়ারীর ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রকাশ্য আদালতে দু’শ টাকা করে জরিমানা করে আদালত। পরে ওই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে এসে বাংলাদেশের আদালতে মামলা করে ধানমন্ডিতে অবস্থিত শতকোটি টাকার এই পরিত্যক্ত বাড়ি নিজেদের দখলে নেওয়ার অভিযোগে এই জরিমানা করা হয়।
আদালত বলেন, সম্পত্তি দখলের জন্য দু’জন এই চক্রান্ত করেছেন। ভবিষ্যতে আর এই ধরনের জালিয়াতি দায়ে অভিযুক্ত হলে কোন ছাড় দেয়া হবে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য কিভাবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি দখলের চক্রান্তে নিজেকে যুক্ত করেন?
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর পরিত্যক্ত সম্পত্তিটি দখলের জন্য একের পর এক মামলা করতে থাকে স্বার্থান্বেষী মহল। কিন্তুু বাড়িটির মূল মালিক হাকিম এস এ আলী ১৯৭১ সালের পর থেকে এদেশে না থাকায় সরকার বাড়িটিকে পরিত্যক্ত বাড়ি ঘোষণা করে। পরে বাড়িটি তৎকালীন সিরাজগঞ্জের এমপি সৈয়দ হায়দার আলীকে ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মাসিক ৭শ টাকা ভাড়া পরিশোধের শর্তে পূর্ত মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে পূর্ত মন্ত্রণালয় বাড়িটি ফেরত নিয়ে নাজমা মজিদকে বরাদ্দ দেন। পরবর্তীতে নাজমা মজিদই নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করে বসবাস করে আসছেন বলে সরকারের কাগজ-পত্রে উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে ১৯৮২ সালে হোসেনে আরা বেগম বাদী হয়ে ঢাকার সাব জজ আদালতে একটি চুক্তি মামলা করেন। মামলায় মরহুম সাইফুল মূলক হাকিম সৈয়দ মোহাম্মদ সাদিকের স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে প্রথম বিবাদী করা হয়। এছাড়া সম্পত্তিটির মূল মালিক হাকিম এস এ আলীকে মৃত দেখিয়ে নাজনীন বেগম, রানা আলী ও ফারজানা আলীকে এস এ আলীর উত্তরাধিকার দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে হাকিম এস এ আলীর কোন উত্তরাধিকার না থাকায় বিবাদীরা মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। পরবর্তীতে নাজনীন বেগম, রানা আলী, ও ফারজানা আলীকে হাকিম এস এ আলীর উত্তরাধিকার হিসেবে দেখিয়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়। হাকিম এস এ আলীর উত্তরাধিকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকেন উল্লেখ করে সর্বশেষ ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম হোসেন পুলিশ ইন্সপেক্টর মো. শাহিনের নামে একটি ভুঁয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করেন। সর্বশেষ সরকারের করা আপিলের শুনানিকালে গত ৭ মার্চ আপিল বিভাগ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিপ্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর ও ভারত থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে আসা মোয়াজ্জেম হোসেনকে তলব করেন। ওই তলবে তারা আদালতৈ হাজির হন। এরপর আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে তারা এ ব্যাপারে কোন সুদত্তর দিতে পারেননি।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ধানমন্ডির একটি পরিত্যক্ত বাড়ি নিজেদের দাবি করে প্রতারকচক্র। ওই প্রতারক চক্রের বক্তব্য শুনে আদালতের কাছে বিশ্বাস হয়েছে যে, তারা প্রতারণা করেছে এবং বাড়িটি তারা আত্মসাতের চেষ্টা করছিল। পরে আদালতে থেকে তাদেরকে জেলে পাঠানো হচ্ছিল, কিন্তু ক্ষমা চাওয়ায় তাদেরকে দু’শ টাকা করে জরিমানা করেন। ফলে সরকার এই পরিত্যক্ত বাড়িটি ফিরে পেল।