হঠাৎ করেই এই আত্মঘাতী হামলা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটাকে জঙ্গিদের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। যারা দীর্ঘদিন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে কাজ করছে এমন তিনজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে জঙ্গিরা যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে তখন অন্য কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে জঙ্গিদের একটি গ্রুপ আত্মঘাতী হামলা চালায়। সহকর্মীদের দেখানোর চেষ্টা করে তাদের কার্যক্রমও থেমে নেই। কারণ অনেক সময় অভিযানের মুখে জঙ্গি দলে যোগ দেয়া অনেক সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। তাদের জঙ্গি পথে ধরে রাখতেই এই ধরনের আত্মঘাতী হামলা হতে পারে।’ গত ১০ দিনে শতাধিক জঙ্গি সদস্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে। এছাড়া ৭ জন জঙ্গি এসব অভিযানে নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অভিযান চলাকালে দুই জঙ্গি আত্মঘাতী হয়ে মারা যায়। আর দুই জন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। এছাড়া আশকোনা র্যাব ব্যারাকে আত্মঘাতী হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনায় একজন গ্রেফতার হয়। পরে সেও মারা গেছে। এছাড়া গতকাল ভোরে র্যাবের তল্লাশি চৌকিতে গুলিতে এক যুবক নিহত হয়। তার শরীরেও বিস্ফোরক বাঁধা ভেস্ট ছিল। সে আত্মঘাতী বলেই র্যাবের ধারণা।
পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘এসব আত্মঘাতী হামলা করে কোনো লাভ হবে না। আমরা জঙ্গিদের কোনো ছাড় দেব না। আমরা কঠোর অবস্থানেই আছি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগে পুলিশের উপর যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছিল সেখানেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পুলিশ। এখনও সেই একইভাবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। জঙ্গিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে।’
এর আগেও ২০০৫ সালে আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জঙ্গিরা অনেকগুলো হামলা করে। এর মধ্যে ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে হত্যা করে জঙ্গিরা। এছাড়া গাজীপুরে বার ভবনে ঢুকে আত্মঘাতী হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেখানেও ৭ জন নিহত হন। ওই ঘটনার পর গ্রেফতার হয় বেশ কিছু জঙ্গি। তখন তারা জানিয়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কিন্তু ওই রাজনৈতিক দলটি সরকারের সহযোগী হওয়ায় বিষয়টি তখন প্রকাশ পায়নি। ওই সময় গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন জঙ্গিকে পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তখনই ওই রাজনৈতিক দলের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়।
র্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘দু’-একটি হামলা করে আমাদের মনোবল দমানো যাবে না। বরং আমাদের মনোবল আরো চাঙ্গা হবে। সেভাবেই কাজ করছি আমরা। অতীতে জঙ্গি দমনে র্যাব যে সাফল্য দেখিয়েছে, সামনেও এই সাফল্য অব্যাহত থাকবে। তিনগুণ মনোবল নিয়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কাজ করছে র্যাব।’
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘জঙ্গিদের শেকড় উপড়ে ফেলার জন্য শুধু অভিযান দিয়ে হবে না। সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবেও সবাইকে কাজ করতে হবে। যারা এই ভুল পথে যাচ্ছে তারা একটা অন্ধ বিশ্বাস থেকে এই পথে যায়। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া বেশ কয়েকজনকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা জিজ্ঞাসাবাদে শুধু বলে স্যার আমাকে মেরে ফেলেন আমি বেহেস্তে যাব। কিন্তু কোনোভাবেই সহকর্মীদের ব্যাপারে কোনো তথ্য দেয় না। এদের প্রশিক্ষণ ও মোটিভেট করা হয়েছে এমনভাবে যে, নির্যাতনে মরে গেলেও মুখ খুলবে না।’
আমাদের খুলনা অফিস জানায়, র্যাবের নির্মাণাধীন ব্যারাকে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার পর খুলনা জেলা কারাগারসহ ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ ২৪টি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদারসহ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর বিশেষ নজরদারি ও তাদের দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, খুলনা জেলা কারাগার, খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনারের কার্যালয়, খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, খুলনা শিপইয়ার্ড, বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্র, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, খুলনা জেনারেল হাসপাতাল, খুলনা বিদ্যুত্ উন্নয়ন কেন্দ্র, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), খুলনা জেলা পরিষদ, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), খুলনা টেলিভিশন কেন্দ্র, গণপূর্ত বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), ফায়ার সার্ভিস, সংসদ সদস্য, বিচারক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাসভবন ইত্যাদি।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মনিরা সুলতানা বলেন, খুলনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অতি সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।