নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৭টি হামলার মূল হোতা হান্নান । এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ১০১ জন ,আহত হয়েছেন ৬০৯ জন। এর মধ্যে একটি হামলা ও দুটি হামলা চেষ্টার ঘটনার মূল টার্গেট ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডা তেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করা হয়।
মুফতি হান্নানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার হিরনে। পড়াশোনা গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিণা আলিয়া মাদ্রাসায়। এরপর ভর্তি হন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন। পরের বছর ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তানে যান এবং ভর্তি হন করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে। সেখান থেকে সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। ওই যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি পেশোয়ারে কুয়েত আল-হেলাল হাসপাতালে চিকিসাত্সাধীন ছিলেন দশ মাস।
আফগানিস্তান থেকে মুফতি হান্নান দেশে ফেরেন ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়। দেশে ফেরার পরপরই পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদিনের হয়ে তত্পরতা শুরু করেন। অবশ্য এর আগেই আফগান ফেরত এ দেশীয় মুজাহিদরা হুজি-বি গঠন করেন। মুফতি হান্নান ১৯৯৪ সালে হুজি-বিতে যোগ দেন। দায়িত্বপান কোটালীপাড়া উপজেলার থানা প্রচার সম্পাদকের। আর সাংগঠনিক দক্ষতায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে হুজির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন মুফতি হান্নান।
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু হয়। হুজি-বির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের দেয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন। যদিও তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ঘটনায় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ফলে জঙ্গিদের বিষয়টি তখন আড়ালেই থেকে যায়। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। তাতে ৮ জন নিহত হন।
২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালীপাড়ায় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে প্রথম আলোচনায় আসেন মুফতি হান্নান ও তার দল। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে থেকে তত্পরতা চালান।
২০০১ সালে ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ ৬টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা। এরপর শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে। এতে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি। তবে এ ঘটনার আগে ওই ( ২০০৪ সাল) বছরের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.) -এর মাজারে বাংলাদেশে তত্কালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ৭ আগস্ট সিলেটের তত্কালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি-বির জঙ্গিরা। হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত হন।