পদ্মা ও মহানন্দার পানি কমছে অস্বাভাবিকভাবে

পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানি অস্বাভাবিকভাবে কমছে। নদী দুটির মাঝে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। দ্রুত নিচে নামছে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। প্রয়োজনীয় সেচ দিতে পারছে না কৃষক। এদিকে, নদীতে পানি কমায় বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নীচে নামছে। প্রতি বছর পানির স্তর ৫ থেকে ১০ ফুট করে নীচে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকায় প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর প্রায় ৪০ ভাগ ও মহানন্দার ৮০ ভাগ অংশে পানি থাকে না। জেগে ওঠা চরে চাষ হচ্ছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল। লোকজন মহানন্দা নদী পায়ে হেঁটেই পার হচ্ছে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর এ অবস্থার কারণে মাছের উত্পাদন কমে গেছে। বেকার হয়ে       পড়েছে শত শত জেলে। নদী সংলগ্ন এলাকায় খাবার পানির জন্য বসানো নলকূপগুলোতে পানি কম আসছে। মে থেকে জুলাই মাস এ অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। কারণ, তখন নলকূপে পানিই উঠে না।

বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন জানান, নলকূপে পানি না উঠায় বাধ্য হয়ে পুকুর-নালার দূষিত পানি ব্যবহার করছে স্থানীয়রা। অনেকক্ষেত্রে সেচের জন্য বসানো গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে লোকজন পান করে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে শুধু বিশুদ্ধ পানি সংকটের কারণে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় বলে শিক্ষকেরা জানান। একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উপজেলার ৮০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীতে বসবাসকারী ৫০ হাজার মানুষের জন্য হস্তচালিত নলকূপ রয়েছে মাত্র ৩০টি।

এদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করে বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরুপ প্রভাব পড়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। সেচের জন্য বসানো গভীর নলকূপেও পানি উঠছে কম। এজন্য কৃষকদের সেচ খরচ বেড়ে গেছে। কৃষকেরা জানান, বৃষ্টি নির্ভর আমন ধান চাষ হয়। অথচ গত কয়েক বছর ধরে সময়মত বৃষ্টি না হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে আমন চাষে। এ প্রসঙ্গে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও ইউডিপিএস নদী ও জীবন প্রকল্প-২ ফোকাল পারসন আমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুমে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানির চাপ বাড়ায় নদীর দুই পাড় ভাঙছে। শুল্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নদীর দুই পাড়ে বিশাল চর জেগে উঠছে। নদীর গভীরতা কমে গেছে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে ডেজিং করে গভীরতা ফিরিয়ে এনে পানি সংরক্ষণ করতে হবে। আর   বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক বনায়ন ঘটানো গেলে বৃষ্টিপাত বাড়বে।  তখন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠে আসবে। আমিনুল ইসলাম আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে পদ্মা ও মহানন্দা নদী ছাড়াও তিস্তা, আত্রাই ও করতোয়া নদীতে পানি হ্রাস পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির উত্স কমে যাচ্ছে।

বিশ্ব পানি দিবস আজ

দেশের সাড়ে ৯ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ তথ্য জানিয়ে বলছে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। কারণ ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারার কারণে এবং মৌসুম ভেদে পানি সঙ্কটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে, শিল্পোন্নয়ন ও কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অতিমাত্রায় নগরায়ন ও অসচেতনতার ফলে পানির অপচয় বাড়ছে। গৃহস্থালি কাজে, শহরে, কল-কারখানায় হচ্ছে পানির অপচয়। এর পাশাপাশি এসব কাজে পানি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত পানি জমিতে যাচ্ছে। যাচ্ছে নদীতে। এই পানির অপচয় ও বর্জ্যযুক্ত পানি নদীতে যাওয়া ঠেকাতে হবে। বিশ্বজুড়েই এই সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পানি দিবস’। বিশ্ব পানি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘কেন পানির অপচয়’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে দিনটি। পানি আমাদের জীবন ধারণের জন্য খুবই অপরিহার্য একটি সম্পদ। আর এই দিবসের লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপদ পানি, পানি সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তোলা। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে খ্যাত হলেও আজো দেশের সব মানুষের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং কৃষিসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা যায়নি।

এদিকে জাতিসংঘ বলছে, পানির অপচয় রোধ করে আর দূষিত পানিকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে। এসডিজি অর্জনে সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের পানির অপচয় রোধ করা যাচ্ছে না। যাচ্ছে না নদী দূষণ বন্ধ করা।  ঢাকার আশপাশে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানি মারাত্মক দূষণের শিকার। এর ফলে রোগ যেমন ছড়াচ্ছে তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও করছে পরিবেশের।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় যেমন পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে তেমনি বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার অন্য নদীর দূষিত পানি এই পানির স্তরে প্রবেশ করছে। এতে ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর তিন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ এবং খুলনা বিভাগে কৃষি কাজের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে অতি মাত্রায় পানি আহরণ করা হচ্ছে। সেখানে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে নদীর প্রবাহ দ্রুত শুকিয়ে যায়। গঙ্গা- মেঘনা - ব্রহ্মপুত্র (জেএমবি বেসিন) এই তিন অববাহিকার পানিই বাংলাদেশের মিঠা পানির প্রধান উত্স। বাংলাদেশের নদীর মূল স্রোতধারার প্রধান অংশ আসে ভারত হয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে আসায় বাংলাদেশের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। পানির অভাবে চোখের সামনে দেশজুড়ে জালের মতো বিছিয়ে থাকা সব নদী একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। যা দেশকে স্থায়ী মরুকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নদীশাসন, বাঁধ নির্মাণ, বড় নদীগুলোর সঙ্গে ছোট শাখা নদীগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রতিকূল পরিবেশ প্রভৃতি কারণেও নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো প্রচণ্ড হুমকির মুখোমুখি। মানুষের অত্যাচারে নদীগুলো মৃতপ্রায়। দখল, ভরাট, আর বর্জ্যে নদীগুলো এখন নিস্তব্ধ স্রোতহীন। নদীর পানি হয়ে উঠেছে কালো আলকাতরার মতো। পদ্মা, তিস্তা এখন মৃতপ্রায়, মেঘনার কোনো কোনো অংশের পানি কালো রং ধরেছে, যুমনায় পড়েছে চর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা দখল ও দূষণের ভারে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে।

ইত্তেফাক/নূহু