স্বাধীনতার গল্প নিয়ে নাটক-টেলিফিল্ম

 
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সৃষ্টিশীল মাধ্যমে প্রভাব ফেলবে—এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের সেই গল্পের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানাতে প্রতিবছরই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নির্মিত হয় বেশকিছু নাটক ও টেলিফিল্ম, যা সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে থাকে। এবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নির্মিত চারটি চ্যানেলের তিনটি বিশেষ নাটক ও একটি টেলিফিল্মের খোঁজ নিয়ে আমাদের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
 
জয়ার জয়
বর্তমান সমাজে এক রাজাকারের ছেলে তার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করছে সেই ইন্টারভিউ দেখছিল ঝুমা চৌধুরী। তারপর মনে পড়ে যায় মেহের আলীর ঘটনা। জয়ার বাবা এক সরকারি কর্মচারী সেই সূত্রে ঢাকা থেকে বরিশালে যেতে হয় জয়াদের। জয়া একটি কলেজে পড়াশোনা করছে, সেই কলেজে সাগর নামের ছেলের রাজনৈতিক ভাষণ, দেশপ্রেম দেখে ভালো লেগে যায়। সেই সূত্রে তাদের মধ্যে কথা হয় এবং ভালোলাগা। একসময় দুজনের মাঝে ভালোবাসা দেখা যায় কিন্তু ধর্ম তাদের মাঝে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তার পরেও ভালোই চলছিল কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই খারাপ হতে থাকে দেশের অবস্থা। জয়ারা হিন্দু বলে তাদের ওপর অত্যাচার বেশি হবে বলে সেই ভয়ে তারা ঘর থেকে কেউ বের হয় না। এই দিকে সাগরও জয়াদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে চলে যায়। এই দিকে মেহের আলী দু-মুখ সাপ। সে জয়াদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে আবার পাকবাহিনীর হাতে তুলে দেয় জয়ার ভাই আর বাবাকে। মেহের আলী পাকবাহিনীর ভয় দেখাতে থাকে জয়ার মা ও জয়াকে। সেই ভয়ে জয়ার মা জয়াকে মেহের আলীর সঙ্গে পাঠায় যেন ভালো ও নিরাপদে থাকে। কিন্তু এক সময় জানতে পারে মেহের আলী মেয়েদেরকে ধরে পাকবাহিনীদের হাতে তুলে দেয় আবার সে নিজেও অত্যাচার করতে থাকে। জয়ার মা এক ফাদারের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলে ফাদার পাকবাহিনীর মাধ্যমে মেহের আলীর কাছ থেকে জয়াকে উদ্ধার করে ভারতে পাঠায়। আর মেহের আলীকে পাকবাহিনী হত্যা করে। সেই সূত্রে বর্তমান সমাজে মেহের আলীর ছেলে তার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করে—এমনি গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ নাটক ‘জয়ার জয়’। খালেদা আহমেদের কাহিনি ও চিত্রনাট্য এবং শরিফুল ইসলাম শামীম ও খালেদা আহমেদের যৌথপরিচালনায় নাটকটিতে অভিনয় করেছেন অপর্ণা ঘোষ, শ্যামল মাওলা, ডলি জহুর প্রমুখ। ‘জয়ার জয়’ নাটকটি বাংলাভিশনে ২৬ মার্চ রাত ৯টা ৫ মিনিটে প্রচারিত হবে।
 
মুক্তির ছোট গল্প
১৯৭১ সালে যুদ্ধে দুই পা হারায় মতিন। সে তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। স্কুল শিক্ষক বাবার অমতেই একদিন গোপনে যুদ্ধে চলে যায়। অবশ্য মা মমতা বেগম সেদিন মতিনকে সহযোগিতা করেছিল যুদ্ধে যেতে। আঁচলের নিচে লুকিয়ে ছেলেকে ভারতের ঢালু বর্ডারে ট্রেনিং ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসেন তার মা। ১৬ ডিসেম্বরের ঠিক কয়েকদিন আগে ময়মনসিংহের হালুয়া ঘাটের তেলিখালী সীমান্তে যুদ্ধরত অবস্থায় মতিনের দুই পায়ে গুলি লাগে। কয়েক মাস চিকিত্সার পর চিকিত্সকদের পরামর্শে তার দুই পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।  যুদ্ধের সময় মতিনের বাবাকে আলবদররা রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে। তার দুই ছাত্র (আল বদর) তাকে ফিরিয়ে দিলেও কদিন পরেই তিনি মারা যান। বেশ কিছু দিন পরে তার মাও মারা যান। একমাত্র বোন মুক্তি, যার জন্ম ৭১-এর শেষে। মৃত্যুর আগে মা মমতা বেগম মুক্তিকে বলে যায় মতিনকে মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে না পাঠিয়ে তার কাছে রাখতে। মাকে কথা দেয় মুক্তি। মুক্তিযোদ্ধা পঙ্গু ভাইকে নিজের কাছে রাখবে। মায়ের কথা মতো বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি নিয়ে আসেন ভাইকে। কয়েক মাস না যেতেই মতিনের উপর বিরক্ত হয়ে মুক্তির উপর মানসিক নির্যাতন শুরু করে মুক্তির স্বামী রফিক। এতবড় বাংলাদেশে বোনের সংসারে আদর যত্নে থাকার সামান্যতম ঠাঁই নেই এই বিজয়ী বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার। চোখের পানি মুছতে মুছতে হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে ভাইকে নিয়ে অজানার পথে হাঁটতে থাকে মুক্তি—এমনি গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে নাটক ‘মুক্তির ছোট গল্প’। এটি রচনা করেছেন দৌলত হোসাইন। আর পরিচালনা করেছেন মো. মামুন খান। এতে অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, সানজিদা প্রীতি, দৌলত, খলিলুর রহমান কাদেরী, ফরহাদ ঠাকুর ও সায়কা আহমেদ প্রমুখ। নাটকটি একুশে টেলিভিশনে স্বাধীনতা দিবসের রাতে প্রচারিত হবে।
 
মুখের দিকে দেখি
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এনটিভির বিশেষ আয়োজনে রয়েছে নাটক ‘মুখের দিকে দেখি’। মাহমুদ দিদারের গল্প অবলম্বনে নাটকটির চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেছেন সেরনিয়াবাদ শাওন। স্বাধীনতার ভিন্ন গল্প নিয়ে নির্মিত এই নাটকে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, এফ এস নাঈম, নাদিয়া মীম, নিকুল কুমার মন্ডল, ইফতেখারুল ইসলাম প্রমুখ। রাত ৯টা ৫ মিনিটে প্রচারিত হবে বিশেষ নাটক ‘মুখের দিকে দেখি’।
 
কালবেলা
২৬ মার্চের সকাল। সারা গ্রামে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতা দিবস। উত্সবের মাঝে দ্রুত গতিতে মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতের কাছে সাইকেল নিয়ে ছুটতে থাকে কৈলাস চন্দ্র। বেওয়ারিশ মৃত ভ্রূণ শিশুকে রাস্তা থেকে সাইকেলে তুলে নিয়ে ঘুরছে সে। তাকে হিন্দু নাকি মুসলমান মতে সমাহিত করা হবে তা জানতে। কারো কাছে সদুত্তর না পেয়ে সে তাকে মাটিচাপা দিয়ে সমাহিত করে সজল চোখে। তার প্রেমিকা মুক্তি রানিকে সমাজের অবিচারের কথা বলে। এবারের স্বাধীনতা দিবসে বেসরকারি একটি বিশ্বাবিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের টিমকে মুক্তিযুদ্ধে আক্রান্তদের নিয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। টিম মেম্বার নুসরাত বাবার তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে ধামরাইয়ের পাল পাড়ায় দত্ত বাড়িতে। সেখানে পরিচয় হয় ’৭১-এর বীরাঙ্গনা মালতী দত্তের যুদ্ধ শিশু মুক্তি রাণীর সঙ্গে। নুসরাত ও শায়নের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে আবেগ মিশ্রিত কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মালতী। —এমনি গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ টেলিফিল্ম ‘কালবেলা’। গাজী ফারুকের রচনায় টেলিফিল্মটি পরিচালনা করেছেন সাদেক সিদ্দিকী। এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সম্রাট, অরিন, আন্না, সাগর, আশিক চৌধুরী, হান্নান শেলী, শাহেনা আক্তার, শম্পা নিজাম, হিরা ও শিশু শিল্পী জারা। টেলিফিল্ম ‘কালবেলা’ এটিএন বাংলায় স্বাধীনতা দিবসে রাত ১১টায় প্রচারিত হবে।