বন্দরের উন্নয়নে করণীয়

বর্তমানে দেশের তিনটি বন্দরের কার্যক্রম চলমান- চট্টগ্রাম, মোংলা এবং পায়রা বন্দর। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান ব্যবহার বলতে গেলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আমাদের চেষ্টা করা উচিত— মোংলাসহ পায়রা বন্দরটিকে পূর্ণমাত্রায় কার্যক্ষম করে গড়ে তোলা।

বর্তমানে হ্যান্ডিম্যাক্স (৫০-৬০ হাজার টন) এবং প্যানাম্যাক্স (৬৫-৭৫ হাজার টন) জাহাজের ব্যবহার বেড়েছে। বড় আকারের এসব জাহাজ চলাচলের জন্য ১২-১৪ মিটার (৪০-৪৫ ফুট) বা এর চেয়ে কিছু বেশি পানির গভীরতা থাকা প্রয়োজন। এ পরিমাণ পানির গভীরতা পায়রা এবং মোংলা বন্দরের বাইরের চ্যানেলে না থাকার কারণে এসব জাহাজকে আংশিক মালামাল নিয়ে বন্দরে আসতে হয়। এদিকে এ দুটি বন্দরের ভিতর  চ্যানেলে পানির গভীরতা বেশি। এই পরিমাণ পানির গভীরতা চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনঙ্গরেও নেই।

শুনেছি, একটি বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পায়রা বন্দরের বাইরের চ্যানেলের খননকাজ আচিরেই শুরু করবে। এ খনন কাজটি সম্পন্ন হলে বন্দরটি পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করতে পারবে। ধারণা করা হচ্ছে, বছর দুয়েকের মধ্যে কেপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ হলে পরবর্তী দশ বছর এ কোম্পানি চ্যানেলটি দেখভাল করবে। বিষয়টি আশাজাগানিয়া। এ সময়কাল শেষ হবার আগেই বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব ড্রেজার জোগাড় করে নিতে পারবেন।

এছাড়া যেকোনো আন্তর্জাতিক নৌ বন্দরের জন্য একটি সক্ষম ‘পালটেজ’ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে এ কাজটি করান ঠিক নয়। ‘কার্যকর’ একটি পাইলট ব্যবস্থা গড়ে তোলার সাথে পাইলট বোট এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক সাহায্যকারী টাগ বোট থাকাও জরুরি। ‘কার্যকর’ শব্দটি বোঝানোর জন্য নিচে একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

আমার মনে আছে, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক বন্দরে জেটিতে ভেড়ার সময় আমার জাহাজের পিছনের দিক কিনারে ঠেকে গিয়েছিল। ঘটনাটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পাইলট সাহেব বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানান এবং পাঁচ মিনিটের ভিতরে কিলবিল করে আটটি টাগ বোট চলে এসে আমার জাহাজটিকে টেনে গভীর পানিতে নিয়ে এসেছিল। আমি সে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলাম।  

আমাদের দেশের অন্য একটি বন্দরে কিছুদিন আগে উল্টো একটি ঘটনাও দেখেছি। বিদেশি একটি জাহাজ  নোঙর ‘ড্রাগ’ করে চরে উঠে গেলে জাহাজটি ভাসানোর কাজে বিদেশি মালিকপক্ষ আমাকে ‘পোর্ট ক্যাপ্টেন’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ কাজটি করার সময় বন্দর পাইলট এবং টাগ বোটের স্বল্পতার কারণে লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছিল। পাইলট আছে তো টাগবোট নেই, টাগবোট আছে তো টাগের পর্যাপ্ত শক্তি নেই! বিষয়টি আন্তর্জাতিক একটি বন্দরের জন্য লজ্জাজনকও বটে। বলতে দ্বিধা নেই, একটি বন্দর সঠিকভাবে পরিচালানোর জন্য বন্দর ভবনের সুরম্য দালান-কোঠা, দামি গাড়ি-ঘোড়া ইত্যাদির চেয়ে বন্দরটিতে একটি দক্ষ পাইলটেজ ব্যবস্থা, পাইলট বোট, টাগ বোট, আগুন নেভানোর বোট ইত্যাদি থাকা বেশি জরুরি।

এছাড়া, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় জাহাজে পাইলট পাঠানো, জাহাজ থেকে রোগী আনা-নেওয়া করা, কি ‘সারস এন্ড রেস্কু’ (SAR) কাজের জন্য বন্দরে দু-একটি হেলিকপ্টার থাকাও বাঞ্ছনীয়। আমাদের বন্দরগুলোতে আগত কমবেশি সকল সমুদ্রগামী জাহাজে হেলি প্যাডের ব্যবস্থা আছে। পায়রা বন্দরে দু-একটি হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হলে, প্রয়োজনে সেগুলো চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরের কাজেও ব্যবহার করা যাবে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতার নিরিখে আমরা যখন পায়রা বন্দরে কমবেশি ৭০-৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খনন কাজে (বিশাল অংকের এই খনন ব্যয় তুলে এনে পরবর্তীতে বন্দরটি ভবিষ্যতে কতটা লাভ করতে পারবে সে বিষয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাব না) হাত দিতে যাচ্ছি, সেখানে বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি এসব কাজ বসিয়ে রাখা ঠিক নয় (মোংলা ‘আউটার বারের’ কমবেশি ১২ কিলোমিটার জায়গা খনন করে দিলে এ বন্দরটিও পুরাদমে কাজ করতে পারে)। 

আপাতদৃষ্টে বন্দর চ্যানেলের খনন কাজ শেষ করা বা পায়রা বন্দরে স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে সেখানে জাহাজ ভিড়াতে সময় লাগবে। এসব কাজ শেষ হবার আগে বন্দরটিকে একটি ‘এংকরেজ পোর্ট’ (জাহাজ নোঙরে রেখে মালামাল ওঠা-নামানোর কাজ করা) হিসাবে ব্যবহার করাই হবে বিবেচনাপ্রসূত কাজ। সে ক্ষেত্রে উপরে উল্লিখিত কাজের পাশাপাশি নিম্নলিখিত কাজগুলোর দিকে আশু নজর দেওয়া উচিত-

১) একটি এংকরেজ পোর্টের কাজে আভ্যন্তরীণ জাহাজের ব্যবহার অনস্বীকার্য। বর্তমানে এসব জাহাজ নদীতে যত্রতত্র নোঙর করে থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নদীর কিছুকিছু জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে এসব লাইটার জাহাজের জন্য ‘মুরিং বয়’ স্থাপন করে দেওয়া উচিত।

২) একটি জাহাজ বন্দরে আগমনের পর বহির্গমন পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানিকারকের প্রতিনিধি, পোর্ট হেলথ, কাস্টমস, সার্ভেয়ার, শিপিং এজেন্ট, স্টিভেডর, শিপ চালনোর মতো অনেক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার লোকজন জাহাজে আসা-যাওয়া করেন। আপাতত পায়রা বন্দর ভবনের সন্নিকটে একটি কন্টেইনার ইয়ার্ডসহ ‘সার্ভিস স্পেস’ গড়ে তোলা হচ্ছে। সংরক্ষিত এ এলাকাটির পাশে, মেরিন অ্যাকাডেমি পতেঙ্গা জেটির আদলে একটি জেটি বানিয়ে দিলে বন্দর ব্যবহারকারী এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জাহাজে যাতায়াতের সুবিধা হবে। এরকম একটি ঘাটের ব্যবস্থা হলে বন্দরে আগত জাহাজের নাবিকগণও সেটি ব্যবহার করে কুয়াকাটা বা ফাত্রার জঙ্গলে ভ্রমণে যেতে পারবেন। এ ঘাটটি বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত স্থায়ী জেটিতেও এরকম একটি ঘাট থাকা জরুরি (মোংলা বন্দরের পানির ঘাট এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ১৫ নং ঘাট সংলগ্ন স্থানেও এরকম দুইটি ঘাট থাকা প্রয়োজন)।

৩) পায়রা বন্দর থেকে ‘ফেয়ার ওয়ে বয়’ পর্যন্ত সার্বক্ষণিক মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করা গেলে ভাল হয়।

৪) বর্তমানে বন্দরে আগত সকল জাহাজের শুল্কায়নসহ কাস্টম কর্তৃপক্ষের যাবতীয় কার্যক্রম খুলনা কাস্টম হাউস (ভ্যাট শাখা) কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। এসব কাজ করার জন্য অতিসত্বর ‘পায়রা কাস্টম হউস’ গঠন করা জরুরি। অন্যথায়, খুলনা কাস্টম হাউসে আইজিএম দাখিল, বরিশালে ট্যাক্স প্রদান, পটুয়াখালী থেকে বোর্ডিং কাস্টম কর্মকর্তা আনয়ন বা সার্ভে সনদে স্বাক্ষর করানো অত্যন্ত ঝামেলা সাপেক্ষ কাজ। এসব ঝামেলার কারণে অনেক আমদানিকারক বা শিপিং এজেন্ট পায়রা বন্দর ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন। এ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখে অতি সত্বর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

৫) শুনেছি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ অচিরেই তাদের নিজস্ব লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে এখানে বেশ কটি স্টিভেডরিং ফার্ম গড়ে তুলবেন। একাজে নতুন কোম্পানিগুলোকে ঢালাই মাল খালাসের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের ক্রয়কৃত গ্রাব, পেলোডার জাতীয় যন্ত্রপাতি বন্দর থেকে ভাড়া দেবার ব্যবস্থা হলে এসব স্টিভেডরিং কোম্পানিগুলোর সুবিধা হবে। 

৬) সর্বোপরি বন্দরের ‘মাস্টার প্লানের’ ব্যাপারে জনগণ অবহিত নন। এ কারণে ভবিষ্যত্ বন্দর ব্যবহারকারীদের অনেকেই তাদের অফিস-কাছারির জন্য স্থান নির্ধারণ করতে পারছেন না। এমতাবস্থায়, কর্তৃপক্ষ চাইলে বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু জমি নির্দিষ্ট করে দিলে সেখানে তারা তাদের নিজস্ব স্থাপনা গড়ে তুলতে পারবেন।

n লেখক : মাস্টার মেরিনার ও শিপিং কনসাল্টেন্ট