ফুলের সুবাস অঞ্জু সরকারের জীবনে ছড়িয়েছে স্বচ্ছলতার সৌরভ। যশোরের কেশবপুরের অঞ্জু পনের বছর আগেও মানুষের বাসায় কাজ করতেন। ফুলের চাষ করে এখন বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। কিনেছেন আট বিঘা জমি, দুটি গাড়ি। ফুলের অর্থনীতি বদলে দিয়েছে অঞ্জুর মতো হাজার হাজার মানুষের জীবন। শুধু ফুলের সুবাস নয় ফুলের অর্থনীতির সৌরভ দেশজুড়েই সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনা। আর সেসব সম্ভাবনার কথা বলতেই রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছে ফুল মেলার।
ফুল সুন্দরের প্রতীক। ফুল ভালোবাসার প্রতীক, পবিত্রতার প্রতীক। অমূল্য কোনো কিছু কাউকে দিতে চাইলে ফুলের কথাই মনে আসে সবার আগে। ফুলের ব্যবহার যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে ফুল চাষ। সৃষ্টি হচ্ছে বাজার। সৃষ্টি হচ্ছে ব্যবসার নতুন খাত। বাড়ছে কর্মসংস্থান। আয়োজকরা বলছেন, বছরে সাড়ে আটশ’ কোটি টাকার দেশি ফুলের বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এ খাতে কাজ করছে ২ লাখ মানুষ। দিন দিন তা বাড়ছে।
বিয়ে, হলুদ, জন্মদিন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্গুন থেকে শুরু করে এমন কোনো অনুষ্ঠান নেই, সেখানে ফুলের প্রয়োজন হয় না। নানা রকম আচার-ব্রত ও উত্সবে ফুলের ব্যবহার চলছে আদিকাল থেকে। বর্তমানে এর চাহিদা ব্যাপক। ফুলের এই চাহিদা মেটাতে ফুল চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। এই প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থানের সঙ্গে বেড়েছে অর্থ উপার্জন ব্যবস্থা। তাই বৈচিত্র্যময় দেশি ফুলের সঙ্গে মানুষের পরিচয় বাড়ানো, ফুলের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ফুলের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
দেশে উত্পাদিত ফুল নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে দ্বিতীয়বারের মতো শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার ফেস্ট-২০১৭’। রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এই উত্সব চলবে পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত। এই ফুল উত্সবের আয়োজন করেছে ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউভেশন সেন্টার ফর এন্টারপ্রাইজেস (আইআইসিই) ও বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি। দ্বিতীয় বারের মতো আয়োজিত এ উত্সবের সহযোগিতায় রয়েছে ইউএসএআইডি, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ও দেশিফুল ডটকম।
ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, কিছুদিন আগেও শৌখিনতায় মানুষ বাড়ির আঙিনায় ফুলের গাছ রোপণ করত এবং পূজা-পার্বণেই ফুলের ব্যবহার করত। বর্তমানে তা পাল্টেছে। ফুল অর্থকরী ফসল হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন ও বিপণন হচ্ছে। ১৯৮২ সাল রজনীগন্ধা ফুল চাষের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল উত্পাদন শুরু হয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪টি জেলায় ১২ হাজার একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হচ্ছে। ফুল চাষ, বিপণন ও ফুল কেন্দ্রীক নানা কাজে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেক্টরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দেশে উত্পাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার ফুল।
ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত যশোর। এ জেলার ঝিকরগাছা, গদখালিসহ নানা জায়গায় ফুল চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। গদখালীতেই শের আলী সরদারের প্রেরণায় বদলে গেছে হতভাগ্য নারীদের জীবন। দারিদ্র্যের কষাখাতে জর্জরিত পরিবারগুলো এখন স্বচ্ছল হয়েছে। দিনবদলের গল্প শোনালেন কৃষক লাকিয়া আকতার লাকী, মোসাম্মত্ তানজিলা ও হাফিজা খাতুন হ্যাপি। লাকীর বাবা শের আলী সরদার ২০০২ সালে পানিসারা গ্রামে গোলাপ চাষ শুরু করেন। তারপর তার পরিকল্পনায় একে একে শুরু হয় রজনীগন্ধা, জার্ভারা, গ্ল্যাডিওলাস ফুলের চাষ।
লাকী বলেন, একদিন ঘরে খাবার ছিল না। দারিদ্র্য ছিল। বাবার পরামর্শে একদিন আমরা ফুলের চাষ শুরু করি, সেই থেকে আর কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন আমরা ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারি। পুরো গ্রামের চিত্র এখন বদলে গেছে।
গতকাল বিকালে প্রধান অতিথি হিসেবে ফুল মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. মকবুল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. আনোয়ার ফারুক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান। আয়োজকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন আইআইসিই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজউদ্দিন মোশাররফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সোসাইটির সহ-সভাপতি নাসের গণি চৌধুরী।
আয়োজকরা জানান, মেলায় দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। শিশুদের জন্য প্রতিদিন সকালে থাকবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এছাড়া বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটির সহযোগিতায় থাকছে ফুল নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। উত্সব প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত। মেলায় ১৪টি প্যাভিলিয়ন ও ৩৩টি প্রদর্শনী স্টল রয়েছে। এক হাজারেরও বেশি ধরনের ফুলের প্রদর্শনীর পাশাপাশি রয়েছে ফুলের ওপর ফ্যাশন শো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুড জোন, কিডস কর্নার, কর্মশালা, ফ্লাওয়ার ল্যান্ডস্ক্যাপিং, ফটো বুথ, ফ্লাওয়ার টানেল ও গোলটেবিল।
ইত্তেফাক/নূহু