কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে খালেদা জিয়া

পাঁচ মাস পর আবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিত্সার জন্য রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল  বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে গতকাল সোমবার বেলা ১২টার কিছুক্ষণ পর তাকে নিয়ে একটি গাড়িবহর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ ীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউর উদ্দেশে রওনা দেয়। ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই গাড়িবহরটি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তাকে কেবিন ব্লকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে গত ১০ মার্চ তাকে বিএসএমএমইউতে আনার সব প্রস্তুতি  থাকলেও তিনি আসেননি।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হকের অধীনে চিকিত্সা নিচ্ছেন খালেদা জিয়া। গতকাল দুপুরে তার নেতৃত্বে অধ্যাপক ডা. জিলান  মিয়া, অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ ছাড়াও হাসপাতালের পরিচালক  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মাহবুবুল আলম ও অতিরিক্ত পরিচালক বেগম জিয়াকে দেখতে ৬২১ নম্বর কেবিনে যান। তারা তার রক্তচাপ, নাড়ির স্পন্দন, তাপমাত্রা  সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।  

বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবিএম মাহবুবুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা খালেদা জিয়াকে দেখেছি। তার সঙ্গে কথা বলে তাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে। উনি আমাদের সঙ্গে বসে কথা বলেছেন। তার পায়ে ও জয়েন্টে ব্যথা আছে। ডায়াবেটিস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, শরীর দুর্বল। ঘুম কম হয় বলে জানিয়েছেন আর খাবারের রুচিও কমে গেছে। তাছাড়া উনি একা  হাঁটাচলা করতে পারছেন না। হাঁটাচলায় আরেকজনের সাহায্য নিচ্ছেন।

খালেদা জিয়া যদি সুস্থ থাকেন তাহলে তাকে ছেড়ে না দিয়ে ভর্তি করানো হলো কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএমএমইউর পরিচালক বলেন, উনি যদি মনে করেন এখানে স্বস্তি বোধ করছেন না তবে চলে যেতে পারেন। যদি এখানে থাকেন তবে প্রতিদিন একজন চিকিত্সক তাকে ভিজিট করবেন। উনি একটি কেবিনে আছেন। আর তার সঙ্গে যারা রয়েছেন তাদেরকে পাশের কেবিনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিএসএমএমইউতে তার প্রয়োজনীয় চিকিত্সা হবে কিনা—  সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, তার কোনো জটিল সমস্যা নেই। বিএসএমএমইউতে চিকিত্সা সম্ভব নয়, এমন কিছু আমরা পাইনি। তার চিকিত্সা করা এখানেই সম্ভব। চিকিত্সক বদলানো হবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আজকে আমরা তাকে যেভাবে দেখেছি, তাতে বর্তমান চিকিত্সক বোর্ডের প্রতি তার আস্থা রয়েছে। যখন মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিত্সকরা তাকে দেখতে যান, তখন উনি বসে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আমাদের কাছে মনে হয়েছে, বোর্ডের ব্যাপারে তিনি সন্তুষ্ট। তাকে চিকিত্সকরা আজ ওষুধ দিয়েছেন। এগুলো নিয়ম মেনে খেতে হবে।

৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়া আর্থ্রাইটিসসহ বয়সজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন মামলার শুনানিতে আদালতে হাজির করার সময় তাকে হুইল চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী মার্চের শুরুতেও খালেদা জিয়াকে একবার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন রাজি হননি। গতকাল কেবিন ব্লকের বাইরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বার বার বলছি তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হোক।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র গতকাল সকালেই কারাগারের একটি ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয় হাসপাতালের কেবিনে। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়ার খবরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্থায়ী কমিটির নেতা মির্জা আব্বাস, মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার দুপুরের আগেই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে এসে কেবিন ব্লকের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন। ব্লকের ২০০ গজ দূরে পুলিশি নিরাপত্তার বাইরে মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খানের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মীকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে কারা কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার তাকে আদালতে হাজির না করায় তার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১০ এপ্রিল নতুন তারিখ ঠিক করে দিয়েছেন বলে খালেদার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার জানিয়েছেন।

প্যারোলে মুক্তির গুঞ্জন: খালেদা জিয়া গতকাল বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন— এমন একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তার প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে কেউ আবেদন করেননি। একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। তেমনটি হলে জানতে পারবেন।