প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অটিজমসহ সকল ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। কাজের প্রতি এসকল বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের একাগ্রতা থাকে অনেক বেশি এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতিও অন্যদের তুলনায় সন্তোষজনক। চাকরির সুযোগ দিয়ে প্রতিবন্ধীদের সূক্ষ্ম মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে উপযোগী কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এছাড়া বিসিএসসহ সকল শ্রেণির সরকারি চাকরিতে অটিজমসহ সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা সংরক্ষিত রয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘দশম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০১৭’ উপলক্ষে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি না করার মন-মানসিকতা ত্যাগ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনো শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রাখা যাবে না। তিনি বলেন, ‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সকল শিশু সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করবে। ফলে এ ধরনের সকল শিশু নিজ পরিবার থেকে বাড়ির নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে সাধারণ শিশুরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সাথে মিশে মানুষের ভিন্নতা সম্পর্কে জানবে এবং ভিন্নতাকে মেনে নেওয়ার শিক্ষা পাবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ২০১০ সালে একটি বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রতিবন্ধিতার কারণে কোন শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা যাবে না’। তিনি বলেন, এতে করে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা লাভ করবে। এতে গোটা সমাজ ব্যবস্থাই উপকৃত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার, ইন্টারনেটেও অন্য সবার মতোই সমান পারদর্শিতার সাথে কাজ করতে সক্ষম। প্রতিবন্ধীবান্ধব সফটওয়্যার, অডিও-ভিডিও শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ তথ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে তিনি সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি অনুরোধ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম একটি স্বাভাবিক অবস্থা। এটি শিশুর শৈশব থেকেই দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আমার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ এর নিরলস প্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অটিজমের গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে এখন বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন। তার উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থ-সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তাদের ভবিষ্যত্ জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই আইনের আওতায় একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট গঠন করেছি। ট্রাস্টের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে আমরা ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছি এবং আমি চাই সমাজের বিত্তবানরা এখানে সহায়তা করবেন। শেখ হাসিনা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘ডিজ্যাবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেম’ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, মূক ও বধির শিশুদের সুষ্ঠুভাবে পাঠদানের লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্নদের জন্য সরকারের সুযোগ-সুবিধা প্রদান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন ও উইথ অটিজম’ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের সকল কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম প্রকৃতির বিচিত্র খেয়াল হলেও অটিজম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অনেকেই অত্যন্ত মেধাবী হয়। তাদের রয়েছে অনন্য প্রতিভা। তাদের প্রতিভাকে বিকশিত করাই আমাদের লক্ষ্য। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, ডারউইন, নিউটন জীবনের একটা সময় অটিজমের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছেন। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী উইলিয়াম বাটলার ইয়টস্, ড্যানিস কবি হ্যানস্ এন্ডারসন, সুরস্রষ্টা বিথোভেন, মোজার্ট প্রতিবন্ধী ছিলেন। বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস্ আজীবন প্রতিবন্ধী থাকলেও তার আবিষ্কার থেমে থাকেনি।
২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২ এপ্রিল দিবসটি বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘স্বকীয়তা ও আত্মপ্রত্যয়ের পথে।’ প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে অটিজম অতিক্রমে সফল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে নীলবাতি প্রজ্বালন করেন।
অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্ব শেষে অটিজম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. মো. মোজাম্মেল হোসেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি একজন মমতাময়ী মায়ের মতো। আর সেই মমতা নিয়েই তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অতীতে এদেশের কোনো সরকার প্রধান করেননি। প্রতিবন্ধীদের জন্য সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের গৃহীত কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণে ঠিক মায়ের মতোই পুতুল অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের সেনাপ্রধানের সাক্ষাত্
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, প্রতিবেশী কোনো দেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাংলাদেশ এই অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে পালন করে যাচ্ছে।
ভারতের সফররত সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।
ইত্তেফাক/নূহু