আটতলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে

রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মামলার জিজ্ঞাসাবাদে একে অপরের উপর দায় চাপাচ্ছেন অভিযুক্তরা। এই ভবনটির আঠারো তলা থেকে তেইশ তলা নির্মাণের নকশা, নথি গায়েব হয়ে গেছে- এমন অভিযোগ পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। নথি গায়েবের বিষয়, ভবনের বর্ধিতাংশের অনুমোদন ইত্যাদির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত চারটি তদন্ত কমিটি পৃথকভাবে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনাস্থল ঘিরে সরকারি সংস্থাগুলোর তদন্ত কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে নিজেদের সব ধরনের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত এফ আর টাওয়ারের জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক ও কাশেম গ্রুপের মালিক বিএনপি নেতা তাসভির উল ইসলামকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে গতকাল থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আগুনের সঠিক কারণ ও ঘটনায় কার কি ধরনের দায়িত্বহীনতা ছিল, তা নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। অনেকেই ধারণা করছেন, আটতলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, মামলায় উল্লেখ করা তিন আসামি ছাড়াও অজ্ঞাত যেসব আসামি করা হয়েছে- তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর রাখছি। ওই ভবনের মালিক, ভবন পরিচালনা কমিটি, ডেভেলপার কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ছাড়াও এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হবে।

ডিবির একটি সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক ও ভবনের বর্ধিত অংশের মালিক বিএনপি নেতা তাসভিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা কেউই অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী নন বলে জানান। তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই ভবন নির্মাণ করেছেন এমন দাবিও করেছেন। জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক ভবনের এ অবস্থার জন্য কাশেম গ্রুপের মালিক, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও ৮ তলার মালিক সেলিম উল্লাহকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন। তিনি ডিবিকে জানান, যখন ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়, যিনি জমির মালিক তার দায় দায়িত্ব তখনই শেষ হয়। সমস্ত দায়দায়িত্ব ডেভেলপার কোম্পানির। ২০০৮ সালে ওই ভবনে প্রথম আগুনের ঘটনা ঘটার পর তিনি অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেই জানিয়ে থানায় জিডি করেছিলেন। তিনি ওই ভবনের অবৈধ নির্মাণ কাজের বিষয়ে রাজউকসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। তখন কেউই ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। আর ভবন নির্মাণের অনুমতিপত্র ও ডিজাইন সবকিছু ডেভেলপার কোম্পানির কাছে থাকে। এ ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী তিনি ভবনের এক তলার কিছু অংশ, দুই তলার কিছু অংশ, তিন তলা, পাঁচ তলা, ১২ তলা, ১৩ তলা, ১৫ তলা ও ১৮ তলার মালিক। ১৮ তলা ভবনের মধ্যে সাড়ে ৯টি ফ্লোর তাকে দেওয়ার কথা থাকলেও রূপায়ণ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মালিক লিয়াকত আলী খান মুকুল অর্ধেক ফ্লোর আজো বুঝিয়ে দেননি। ফলে তিনি ভবন থেকে এক ধরনের বিতাড়িত ছিলেন।

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বিএনপি নেতা তাসভির উল ইসলাম বলেন, ভবনের ১৯ তলা থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ রাজউকের অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে। এর সব কাগজপত্র ও ডিজাইন রূপায়ণ ডেভেলপার কোম্পানির কাছে আছে। তিনি আরো বলেন, আট তলার মালিক সেলিম উল্লাহর সঙ্গে ভবন পরিচালনা কমিটির দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেলিম উল্লাহ ওই ভবনের দশ তলায় সিঁড়ির প্রবেশ মুখে গেট স্থাপন করে নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি তার ফ্লোরে রান্নাঘর ছাড়াও অস্থায়ী বিদ্যুত্ সংরক্ষণের জন্য আইপিএস ছিল। এছাড়া তার স্পেক্ট্রা গার্মেন্টসে ব্যবহূত কেমিক্যালও আট তলার স্টোর রুমে রাখা ছিল। তাই এই অগ্নিকাণ্ডে কারো দায় থাকলে সেটা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও আট তলার মালিকের।

এদিকে, ঘটনার চারদিন পরও এফআর টাওয়ার ঘিরে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে এখনও কাঁচ খসে নিচে পড়ছে। পুলিশ পুরো ভবন নিজেদের কব্জায় রেখেছে। ভবনটি হেলে পড়ায় নানান আতঙ্ক রয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে তদন্ত টিম: গতকাল সকালে পূর্ত ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিসের কমিটি, আইইবি ও বুয়েটের প্রতিনিধিদল আলাদাভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনা তদন্ত করেছে।