দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলোর ফসল তলিয়ে যাওয়ার জন্য বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অর্থ লোপাটসহ নানা অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দিকে উঠেছে অভিযোগের আঙ্গুল। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান গতকাল বলেছেন, অনিয়ম তদন্তে সরকার উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করবে। গতকাল রবিবার ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম’ এর এক সাংবাদিক সম্মেলনে ফসল ডুবির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। হাওর এলাকায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ায় গভীর উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও। ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে দেশের বিত্তবান ও স্বচ্ছল ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন হাওর অঞ্চলের মানুষ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এবার সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট ও কিশোরগঞ্জে এক লাখ ৭১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এতে ওই তিন জেলায় ২ কোটি ৫ লাখ মন ধান কৃষকের ঘরে উঠছে না। ফসলডুবির ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। নিজের ক্ষেতের ধান নষ্ট হতে দেখে অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উল্লেখ্য, হাওর এলাকার জমি এক ফসলি। এক মওসুমের ফসল দিয়ে তাদের সারা বছর চলতে হয়।
বাঁধ ভেঙ্গে ফসলডুবির ঘটনায় গতকাল রবিবার সকালে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় তোপের মুখে পড়েন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি। সভায় ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেন, পাউবো’র ঠিকাদার ও পিআইসিদের গাফিলতিতে সুনামগঞ্জে প্রায় ২০ লাখ কৃষক দুর্ভোগে পড়েছেন। তারা পাউবো ও পিআইসি’র দুর্নীতির তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত বিল না দেওয়ার দাবি জানান।
সভা শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুনামগঞ্জে ৭০ ভাগ জমির ফসল ডুবেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিও এজন্য দায়ী। এগুলো খতিয়ে দেখার জন্য এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি করার জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করবো। অপরদিকে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার ও সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও সদর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন। ।
এদিকে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে দিন দিন বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। জেলায় এ বছর দুই লাখ ২৩ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরের এই ফসল রক্ষায় ৫৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে। কৃষকদের অভিযোগ-বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া এবং কাজে অনিয়মের কারণেই হাওরে এই অসময়ে ফসলহানি ঘটেছে। ইতিমধ্যে ভারী বৃৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে শতাধিক হাওরের ১ লাখ ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটির টাকার উপরে।
এদিকে, রিপোর্টার্স ইউনিটির সংবাদ সম্মেলনে হাওর অ্যাডভোকেসির যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান বলেন, গত ১১ থেকে ১৩ মার্চ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করে তারা বাঁধ সংস্কারের কাজে নানা অব্যবস্থাপনা দেখেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার বলেন, এবার হাওরের মানুষ দুর্ভিক্ষে পড়বে। আগের বছরগুলোতে হাওর পানিতে ডুবে গেলেও ধান পাকা থাকে। তখন পানির তল থেকে হলেও কিছু না কিছু ধান কেটে আনা হয়। এবার ধান ক্ষেতে থোড় আসেনি। এমন বিপর্যয় আমি কখনো দেখিনি। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটি জেলাতেই (সুনামগঞ্জ) যদি বছরে ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে বলব না, টাকার কোনো অভাব ছিল। বিষয়টা খুব স্পষ্ট যে দুর্নীতির মধ্যে দিয়েই টাকাগুলো আত্মসাত করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর এলাকার কৃষক মাফিকুল ইসলাম বলেন, আমি এবার অপরের জমিসহ মোট ৬ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। কিন্তু বাঁধ ভেঙে সব শেষ হয়ে গেছে।
একটি স্লুইস গেটের জন্য
ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, একটি স্লুইস গেটের কারণে ওসমানীনগর-বালাগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরের প্রায় ৫শ’ হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ওসমানীনগর উপজেলার মানুষ চক রুহিনী হাওর, ছাউনিয়া হাওর ও ডোবার হাওরে উচ্চ ফলনশীল বেরো চাষ করেন। কিন্তু একটি স্লুইস গেটের কারণে কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় এসব হাওরগুলোর শতভাগ ফসল এখন পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা এই স্লুইস গেটটি অপসরাণের দাবি জানিয়েছেন।
নেত্রকোনায় বিক্রি হচ্ছে গবাদি পশু
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনার হাওর এলাকাসহ দশটি উপজেলায় গত রবিবার পর্যন্ত পানিতে নিমজ্জিত বোরো জমির পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর। তবে সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে ৩৮ হাজার ৩২০ হেক্টর। মোহনগঞ্জ এবং খালিয়াজুরীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়েছে। এক মুঠো ধানও তারা ঘরে তুলতে পারেননি। গত ১৫ বছরেও তাদের এ রকম ক্ষতি হয়নি বলে তারা জানান। তারা বলেন, গত ১০ দিন যাবত্ এই বোরো ধান জমি পানির নিচে রয়েছে। ফলে এ ফসল আর রক্ষা করা যাবে না। ইতিমধ্যে পানির নিচে থাকায় তা পেঁচও গেছে বলে কৃষকরা জানান। পানির জন্য তারা বাড়ি ঘরে গবাদি পশুও রাখতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ৪০ হাজার টাকা মূল্যের গরু ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে হাওর এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, বছর বছর বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সে বাঁধ আর নির্মাণ করা হয় না। যখন পানি আসার সময় হয়, তখন কর্তৃপক্ষ বাঁধ নির্মাণের নামে নামমাত্র কিছু মাটি ফেলেন। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর।
এদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, হাওর এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে ভবিষ্যতে এই এলাকার বোরো ফষল রক্ষা করা আর কখনই সম্ভব হবে না। এব্যাপারে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ড. মোঃ মুশফিকুর রহমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এই প্রতিবেদনে একবার মাত্র ৩শ’ কোটি টাকা খরচ করলে প্রতি বছর ৫ শ’ কোটি টাকার ফসল রক্ষা সম্ভব বলে বলা হয়েছে।
ছাতকে বেড়িবাঁধ সংস্কারে সিকি ভাগ কাজ হয়নি
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ছাতকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩টি হাওরের ১০ সহস্রাধিক হেক্টর বোরো ফসলের পুরোটাই তলিয়ে গেছে। হাওর রক্ষা বাঁধ সংস্কার কাজে এ মৌসুমে প্রায় ১৯ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ দেয়া হলেও সিকি ভাগ কাজ হয়নি বলে হাওর পাড়ের কৃষকরা অভিযোগ তুলেছেন। জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ডেকার হাওর, নোয়ারাই ইউনিয়নের নাইন্দার হাওর ও সিংচাপইড় ইউনিয়নের চাউলীর হাওর রক্ষায় বেড়িবাঁধ সংস্কারে প্রতিবছরই লাখ-লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদার ও পিআইসি’র যোগসাজশে কাজ হয় নামমাত্র। সিংহভাগ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। কৃষকদের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ সংস্কারের নামে প্রতি বছরই লাখ লাখ টাকা হরিরলুট হয়।
হাওরে ফসলডুবিতে উত্কণ্ঠায় রাষ্ট্রপতি
কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওর এলাকায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ায় উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। রবিবার রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হাওর পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের উদ্বেগের কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, হাওর এলাকার জনগণ একটি মাত্র ফসলের উপর নির্ভর করে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। ফসল কাটার আগ মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে প্রতদিনই হাওর এলাকার জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে এলাকার জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করছে।
হাওর এলাকার মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হলেও এবার ক্ষয়ক্ষতি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। হাওর পরিস্থিতি নিয়ে এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আলাপ করেছেন বলে তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়ে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হাওর এলাকার জনগণের দুর্দশা লাঘবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান। রাষ্ট্রপতি টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাঁধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়।
সিলেট অফিস জানায়, ভারী বর্ষণ,পাহাড়ী ঢল হ্রাস পেলেও বৃষ্টি একেবারে পিছু ছাড়েনি সিলেটের। যখন তখন বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। মাঝে মাঝে ঝড় হচ্ছে। তাই কৃষকদের উদ্বেগ কমেনি। অন্যদিকে ফসল হারা লক্ষাধিক কৃষকের কান্না আর আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে আছে। সিলেটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচলাক ড. মামুন উর রশীদ গতকাল রাতে ইত্তেফাককে জানান, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৬৯ হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষতি এখন পর্যন্ত নিরুপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল সুনামগঞ্জেই ৯৭ হজার ৮৬২ হেক্টর এবং সিলেটে ৫৮ হাজার ৭১০ হেক্টরের ফসলের ক্ষতি হয়।
রাজপথে কৃষক
সুনামগঞ্জের হাওরে ফসলডুবির ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার কৃষক দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেমেছেন। তারা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সভা করেছেন। এসব সমাবেশে পাউবোর কাজের সুষ্টু তদন্ত, দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার ও পিআইসি‘র সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার, তদন্তের আগে ঠিকাদারদের বিল না দেওয়া, জরুরি ভিত্তিতে খোলা বাজারে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ শুরু, ইজারাকৃত জলমহালের ইজারা বাতিল, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান, গ্রামে গ্রামে রেশনিং প্রথা চালুসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু