হাওরাঞ্চলে কৃষকের চোখে অন্ধকার, বুকে চাপা কান্না

সারা বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে এখন হাওর পাড়ের কৃষকদের চোখে মুখে শুধু অন্ধকার আর চাপা কান্না। কেমন করে চলবে তাদের আগামী দিনের জীবন? এ চিন্তায় অনেকে অস্থির। এই হাওরে বছরে একমাত্র ফলে বোরো ধান। সারাবছর এ ধান দিয়েই চলে তাদের জীবনযাত্রা। হাওরে পাহাড়ি ঢল আসলেও এভাবে কখনই ফসল তলিয়ে যাওয়া বা বিনষ্ট হওয়ার কথা শোনা যায়নি। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এবার পানি এসেছে বেশি।

নেত্রকোনা থেকে শ্যামলেন্দু পাল জানান, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন এবং খালিয়াজুরী উপজেলা জুড়ে শুধু হাওর আর হাওর। সেখানে এবার বোরো ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আগামী ৫ বছরেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। এই হাওরে বোরো ধান ছাড়া আর কোনো ফসল উত্পন্ন হয় না। তাই তাদের পুরো এক বছর বসে থাকতে হবে। এই সময়ে তারা কোনো কাজ পাবেন না। খালিয়াজুরীর কৃষক আফজাল মিয়া (৪৮) বলেন, ‘ধানতো শেষই অইছে, অহন গরু রাখারও জায়গা নাই, গরুরে খাওয়ানোর ঘাস নাই, নাই কাম কাজ, আমরা যে অহন কি করবাম তা বুজতাছি না, বোধয়, না খাইয়া মরণ লাগবো’। এখানকার আফিল উদ্দিন জানান, হাওরের সকল বাঁধ বিধ্বস্ত। সরকার টাকা দিলে বাঁধ নির্মাণের নামে  আবার চুরি হবে। কিন্তু বাঁধ আর হবে না। উল্লেখ্য, নেত্রকোনার কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৪০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে এই পরিমাণ ধানের বাজার মূল্য প্রায় ৫ শত কোটি টাকা।

জেলা প্রশাসক ড. মোঃ মুশফিকুর রহমান জানান, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ১০ টাকা কেজির চাল এবং কর্মসৃজন কার্যক্রম চালুর জন্য সরকারের নিকট জানানো হয়েছে। এছাড়া সরকারের কৃষি ঋণ পরিশোধে তাদের প্রতি কিছুদিন নমনীয় থাকার জন্যও বলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি সুবীর বসাক জানান, গত দু’দিন ধরে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে না আসা এবং বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদ-নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও জেলার হাওরাঞ্চলের  কৃষকদের কান্না কিন্তু থামেনি। চোখের সামনেই  স্রোতের তোড়ে বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার একর বোরো জমির ধান তলিয়ে যেতে দেখেছেন তারা। গ্রামবাসী রাত-দিন খেটেও বাঁধ রক্ষা করতে পারেনি। ফলে বিনষ্ট হয়ে যায় হাজার হাজার একর জমির। হাওরবাসীদের সারা বছরের একমাত্র উত্পাদিত ফসল হচ্ছে বোরো। উদ্বৃত্ত বোরো ধান বিক্রি করেই তাদের সারা বছরের সংসারের খরচ চলে। জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, গত ৩০ মার্চ থেকে হাওরাঞ্চলে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুরু হয়। গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা, করিমগঞ্জ, নিকলী, বাজিতপুর ও ভৈরব উপজেলার  মোট ২২ হাজার ৯৮ হেক্টর বোরো জমির ধান  উজান থেকে নেমে আসা ঢল, অতিবৃষ্টি, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। বাঁধ ভেঙে আংগানের হাওর, এলংজুড়ি হাসিমপুর হাওর, জোড়কান্দা হাওর, বিলাইরা হাওর, লাইমপাশা হাওর, গজারিয়া হাওর, বনপুর হাওর,        মেহেরপুর হাওর, হুরকান্দা হাওর প্রভৃতি হাওরের বোরো জমি পানিতে সম্পূর্ণরূপে  নিমজ্জিত হয়। উল্লেখিত এলাকার এক ছটাক ধানও কৃষকরা ঘরে তুলতে পারেনি। তাছাড়াও কৃষকরা এখন তাদের গবাদিপশু নিয়েও মহাবিপদে পড়েছে। ইতিমধ্যে হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র গো-খাদ্য সংকট। খাদ্য জোগাতে না পেরে কৃষকরা তাদের গবাদিপশু পানির দরে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। হাওরাঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষকই সরকারি কৃষিঋণ কিংবা মহাজনী ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করে থাকেন। এবছর ফসল মার খাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চিন্তায় তাদের মাথায় হাত উঠেছে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক হাওরাঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর জমির বোরো ফসল রক্ষা করতে স্থানীয় কৃষকরা ৪টি খালের মুখে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করেছেন। মোজাফরপুর ইউনিয়নের বর্ণি নদী তীরবর্তী জালিয়ার হাওরের কয়েক হাজার একর জমির বোরো ফসল রক্ষা করতে মোজাফরপুর কচুয়া খালে মুখ, দাইরের খালের মুখ, কালারিয়া খালের মুখ ও কান্দিউড়া ইউনিয়নের কইজানি নদীর তীরবর্তী বেউরি খালের মুখে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেও যেভাবে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে তাদের মনের আতংক কিছুতেই কাটছে না। ইতিমধ্যে নদী তীরবর্তী প্রায় ৭ একর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও অতি বৃষ্টিতে সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলো প্লাবিত হয়ে কৃষকের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। হঠাত্ করেই দাম বেড়েছে সব ধরনের চালের। এতে বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

গতকাল সোমবার সিলেটের চালের পাইকারি বাজার কালিঘাট ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা চালের দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা কেজিতে বাড়িয়ে দিয়েছেন ৫ থেকে ৬ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, মিল মালিকরা বৃষ্টি আর বন্যার সুযোগে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। চালের দাম বাড়ার খবরে গতকাল দুপুরে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল নগরীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করেন।

ইত্তেফাক/নূহু