সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় যাত্রী হয়রানি বেড়েছে!

রাজধানীতে বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত বাসের ‘সিটিং সার্ভিস’, ‘গেইট লক’ সেবা বন্ধ হওয়ায় যাত্রী দুর্ভোগ ভয়ানক পর্যায়ে উঠেছে। বিশেষ করে অফিসগামী নগরবাসীর যাতায়াত কষ্ট সীমা ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে নারী যাত্রীরা। আবার সব বাস লোকাল সার্ভিসে পরিণত হলেও কোন পরিবহন মালিকই ভাড়া কমাননি। এরই মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চলমান অভিযান সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মোটা অংকের জরিমানার ভয়ে অনেক মালিক তাদের বাস রাস্তায় নামাননি।

আগের দিনের মতোই গতকাল রাজধানীজুড়ে দেখা দেয় মারাত্মক পরিবহন সংকট। প্রতিটি বাস স্ট্যান্ডেই নারী যাত্রীদের বাসে ওঠা নিয়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছে। লোকাল বাসে গাদাগাদি করে ওঠে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে অধিকাংশ যাত্রীকে। ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে বিভিন্ন স্থানে যাত্রীরা মারধরের শিকার হয়েছেন।

নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীর তুলনায় বাসের সংখ্যা ছিল খুবই কম। বিকালে অফিস ছুটির পর মতিঝিল, জিপিও থেকে যেসব বাস আসে, তার সবই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। পল্টন থেকে অনেককেই বাদুড়ঝোলা হয়ে গন্তব্যে রওনা দিতে হয়েছে।

সেবার মান নিচে নামিয়ে আনার পরও ভাড়া কেন কমলো না তা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের বাক-বিতণ্ডা লেগেই ছিল দিনভর। স্বজন পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব ১১-১৫২১) মতিঝিল    এলাকায় যাত্রীদের বলা হয়েছে, শাহবাগ নামলে ১৫ টাকা ভাড়া দিতে হবে। যারা প্রেসক্লাবে নামবে তাদের দিতে হবে ১০ টাকা। এ পথে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৭ টাকা। অভিযোগ পাওয়া গেছে সদরঘাট-মিরপুর রুটে চলা ‘শিকড় পরিবহন’, মতিঝিল-মিরপুর রুটের ‘বিকল্প পরিবহন’, সদরঘাট-মিরপুর-১২ রুটের ‘ইউনাইটেড পরিবহন’, সদরঘাট-মিরপুর-১০ রুটের ‘বিহঙ্গ পরিবহন’ আগের মতোই বাড়তি ভাড়া আদায় করেছে।

নারী যাত্রীদের পরিবহনে ওঠা নিয়ে পড়তে হয়েছে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায়। লোকাল সার্ভিস হয়ে যাওয়ার কারণে নারীদের নির্ধারিত আসন দ্রুত পূর্ণ হয়েছে। এ কারণে পরবর্তী সময়ে নারী যাত্রী বাসে উঠতে চাইলে হেলপার বলছে, ‘লেডিস সিট খালি নাই’। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাসের ওঠার বিড়ম্বনা সহ্য না করে ঘোরা পথে বেশি টাকা দিয়ে বাড়ি ফিরেছে।

এদিকে ভাড়া নিয়ে তর্ক বিতর্কে বিভিন্নস্থানে যাত্রীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন। দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার ইন্দ্রজিত্ সরকারকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। এ ঘটনার প্রত্যক্ষ করে সেখানে অবস্থান নেয়া ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ও পুলিশ সদস্যরা। পরে এক পুলিশ সদস্য তাকে শ্রমিকদের হাত থেকে রক্ষা করেন। এ ব্যাপারে ইন্দ্রজিত্ সরকার জানান, পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিউ ভিশনের বাসে ফার্মগেট থেকে মিরপুর যাচ্ছিলেন। আসাদগেটে বাসটি ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে ধরা পড়ে। বিভিন্ন অভিযোগে বাসটিকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল সালাম। বাসটি দীর্ঘ সময় থেমে থাকায় ইন্দ্রজিত্ হেলপারের কাছে ভাড়া ফেরত চান। ভাড়া ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই তাকে মারধর করে পরিবহন শ্রমিক নেতারা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইতিহাস পরিবহনের পরিচালক রিপন মোল্লা সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা স্বীকার করেন। তিনি জানান, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ভূইয়া হুমায়ুন কবির তপনের নেতৃত্বে পরিবহন মালিকদের একটি ভিজিলেন্স টিম আসাদ গেটে ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইন্দ্রজিত্ সরকারকে মারধর করেন।

হঠাত্ পরিবহন সংকট সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে পরিবহন মালিকরা জানিয়েছে, ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক হেলপারদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। এ কারণে অনেকেই গাড়ি চালাতে চাইছেন না। তাই অনেক মালিক বাস বের করতে পারছেন না।

বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমান আদালত গতকাল রাজধানীর আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, আসাদগেট, বিমানবন্দর ও রমনা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। গতকাল ১১৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে দুই বাস চালককে। আটক করা হয়েছে একটি গাড়ি। ডাম্পিংয়ে পাঠানোর হয়েছে আরেকটি।

বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার বলেন, কেউ গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি সৃষ্টি করলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের অনুরোধ, যাত্রীরা যেনো সরকারির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত না দেয়।

ইত্তেফাক/নূহু