কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) নবনির্বাচিত মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির খবরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। সাক্কু যে কোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন কিংবা তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হতে পারে- এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে নগরীতে।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে ১১ হাজার ভোটে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মতো কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মামলার জালে আটকে যেতে পারেন, গেজেট-শপথ হলেও আদৌ চেয়ারে বসতে পারবেন কি-না এমন আশংকা ছিল বিভিন্ন মহলে। সাক্কু নিজেও এমন আশংকা করেছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার ১৯ দিনের মাথায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার একটি আদালত।
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন করার অভিযোগে ২০০৮ সালে ঢাকার রমনা থানায় দুদকের সহকারী পরিচালক শাহিন আরা মমতাজ বাদী হয়ে কুমিল্লা পৌরসভার তত্কালীন মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও তার স্ত্রী আফরোজা জেসসিন টিকলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আট বছর তদন্ত শেষে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। তবে এ মামলার অভিযোগের দায় থেকে সাক্কুর স্ত্রীকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।
মঙ্গলবার এ মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র বিশেষ জজ কামরুল হোসেন মোল্লা মামলার চার্জশিট আমলে নিয়ে সাক্কুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এছাড়াও আদালত সাক্কুর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেন এবং একই সঙ্গে তার গ্রেফতার সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য আদালত আগামী ৯ মে দিন ধার্য করে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ১২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাক্কু দুদকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছিলেন।
মনিরুল হক সাক্কু ইত্তেফাককে জানান, ‘আমি ওই মামলায় হাজির না হওয়ার কারণে আদালত এ আদেশ জারি করেছে। আমি সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্থায়ী জামিন নিয়েছিলাম। তবে আমার আইনজীবী বিষয়টি আদালতের কাছে উল্লেখ না করায় এমন আদেশ হয়েছে। আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে বুধবার (আজ) আদালতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’ তিনি আরো জানান, ‘সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় আমি যে ১২টি মামলার (চলমান, অব্যাহতি, খালাস, মুক্তি) বিবরণ উল্লেখ করেছিলাম তন্মধ্যে দুদকের এ মামলাটি ছিল ১ নম্বর ক্রমিকে এবং যা আমলে গ্রহণের জন্য শুনানির অপেক্ষায় ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।’
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন মহলের লোকজন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে কুসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আঞ্জুম সুলতানা সীমা বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে, তদন্ত ও বিচারে মনিরুল হক সাক্কু দোষী হলে বিচার হওয়া উচিত। এর বেশি তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘সাক্কু জনপ্রিয় ও নির্বাচিত মেয়র, তার বিরুদ্ধে এ মামলাটি দুদক বাদী হয়ে বিতর্কিত ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের ১/১১ সরকারের সময়ে দায়ের করেছিল। ওই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপার্সনসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে অনুরূপ মামলা দায়ের করা হয়েছিল।’ কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ মোঃ ওমর ফারুক বলেন, ‘সাক্কুর হলফনামায় দুর্নীতির এ মামলার তথ্য রয়েছে। সে দুর্নীতি না করলে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় পালিয়ে থাকার কথা নয়।’ সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি আলী আকবর মাছুম জানান, ‘সাক্কু কুমিল্লা সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যে হঠাত্ করে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।’
ইত্তেফাক/নূহু