তাওহিদুলের পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল উত্পাদন

>> মামুনুর রশিদ রাজিব

 

পরিত্যক্ত পলিথিন বিশ্বে পরিবেশদূষণের জন্য সবচেয়ে ভয়ানক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু যখন এর বিপরীতে সমাধানের কার্যকরী তেমন কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক তখনই অজপাড়া গাঁয়ে বেড়ে ওঠা এক যুবক আত্মপ্রকাশ করলেন পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে। শুধু তাই নয়, তার এই আবিষ্কার পরিত্যক্ত পলিথিনকে যেমন পরিবেশ থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, সেই সাথে এর মাধ্যমে পেট্রোল ও ডিজেল উত্পাদন করছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশকে পলিথিনের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, তেমনই অপর দিকে এই পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা জ্বালানি খাতকেও শক্তিশালী করছে। আর যুগান্তকারী এই গবেষণা যার প্রায় একযুগ সাধনার ফসল, তিনি হলেন জামালপুরের কোজগড় গ্রামের মোহাম্মাদ তৌহিদুল ইসলাম। অজপাড়া গাঁয়ে বেড়ে ওঠা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) পাস করা তাওহিদুল এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এটুআই কর্তৃক আয়োজিত ‘বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগিতা’ ও ‘উদ্ভাবকের খোঁজে’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ‘পরিবেশ পদক-২০১৮’ জিতে নিয়েছেন। এসময় তার হাতে পদকটি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পিছনের গল্প বলেন, ‘আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাগানে কিছু গাছ লাগাই। কিছুদিন পর দেখলাম লাগানো গাছগুলো মধ্যে একটা গাছের কোনো উন্নতি তো দূরের কথা, বরং দিনে দিনে মারা যাচ্ছে। তখন মনে কৌতূহল জাগলো, গাছের নিচে মাটির ভিতরে লুকিয়ে থাকার রহস্য উদঘাটনের। দেখতে ইচ্ছে হলো এমন কোন দৈত্য লুকিয়ে আছে, যা চারাগাছটাকে বেড়ে ওঠার পরিবর্তে তিলেতিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন মাটি খুড়লাম, দেখলাম গাছের নিচে যমের মতো জাল বিস্তার করে অবস্থান করছে একটা পরিত্যক্ত পলিথিন ব্যাগ। আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, মাত্র একটা পরিত্যক্ত পলিথিন ব্যাগ পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতি করতে পারে। অথচ আমরা দৈনিক হাজার হাজার কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এখানে সেখানে ফেলে দিচ্ছি। তাই এ সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে শরণাপন্ন হলাম আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। কিন্তু তারা কোনো সমাধানের পথ না দেখাতে পারলেও দেখিয়ে দিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসে দেখলাম এখানে গবেষণা তো দূরের কথা, এখানকার ল্যাব রুমটা যে কতদিন ধরে তালা দেওয়া তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবশেষে আমি এসএসসি পাস করে জামালপুর শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের ল্যাবের দায়িত্বে থাকা স্যার ইকরামুজ্জামানের কাছে বিস্তারিত বলে সাহায্য চাইলে তিনি আগ্রহ সহকারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু অনেক প্রচেষ্টার পরও পলিথিন ব্যাগ ধ্বংসে আমাদের সম্মিলিত গবেষণা ব্যর্থ হলে একপর্যায়ে শিক্ষক আমাকে সাহায্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু, আমি সেখানেই থেমে যাইনি। নিজের বাড়িতেই একটা ছোট্ট গবেষণা কেন্দ্র বানিয়ে ফেললাম। এরমধ্যে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন লাইব্রেরিতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম পলিথিন আসলে উচ্চ তাপমাত্রার জৈব যৌগ। এবার আমার একটা ধারণা হলো, পলিথিন ধ্বংসে নিশ্চয় উচ্চ তাপমাত্রার কোনো প্রভাব আছে। তাই কনিকাল ফ্লাক্সে পলিথিন ব্যাগ নিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় তাপ দিতে থাকলাম। কিন্তু একপর্যায়ে হঠাত্ বড় ধরনের বিপত্তি ঘটল। উচ্চ তাপ দেওয়া কনিকাল ফ্লাক্স বিস্ফোরিত হয়ে আমার ঘর আগুন লেগে যখন পুড়ে যায়, তখন পরিবারের লোকসহ সবাই আমাকে এই কাজে নিরুত্সাহিত করতে থাকেন। কিন্তু আমিও থেমে থাকার পাত্র নই। অনেক কষ্টে মায়ের অনুমতি নিয়ে আবারও গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করি এবং এক পর্যায়ে দেখতে পাই কনিকাল ফ্লাক্স থেকে ধোঁয়ার মতো গ্যাস বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি সেগুলো সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কোনো পাত্রে নিতে গেলে দেখি পাত্রের নিচে কিছু তরল জাতীয় পদার্থও জমা হচ্ছে। এক সময় পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখতে পাই উত্পাদিত অংশের তরল পদার্থটুকু অশোধিত পেট্রোলও ডিজেল এবং সঙ্গে  যে গ্যাসটা দেখা যাচ্ছে ওটা জ্বালানির কাজে ব্যবহারযোগ্য। এভাবেই আমার দীর্ঘ প্রায় একযুগের গবেষণায় সফলতার মুখ দেখি। আমার এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছি “ফুয়েল ফ্রম ওয়েস্টেজ প্লাস্টিক অ্যান্ড পলিথিন”।’

এছাড়া তিনি তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি চাই, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্ব-পরিবেশ একদিন পরিত্যক্ত পলিথিন নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে।’ উল্লেখ্য, তাওহিদুল হাসান তার গবেষণালব্ধ পদ্ধতি থেকে একদিন অন্তর অন্তর প্রায় ১০০ লিটার ডিজেল ও পেট্রোল উত্পাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন। প্রতি লিটার জ্বালানি তেল উত্পাদনে তার ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩৭ টাকা। এছাড়া, এই জ্বালানি তেল উত্পাদনের সঙ্গে ছয়জন নিয়মিত কাজ করছে এবং বিশজন কাগজ কুড়ানো ছেলেদের কাছ থেকে নিয়মিত কাঁচামাল হিসেবে পরিত্যক্ত পলিথিন কিনে নিচ্ছেন তিনি।