মুষুলধারে বৃষ্টির মধ্যে চোখের জলে আর শ্রদ্ধায় তাকে বিদায় জানানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, সুরকার, সংগীত পরিচালক লাকী আখান্দকে। কিংবদন্তী এই শিল্পীর প্রথম জানাজা শনিবার সকাল ১০টার একটু পরে পুরান ঢাকার আরমানিটোলা মসজিদের সামনের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে শিল্পীর মরদেহ নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। বেলা সাড়ে ১১টায় তাঁর মরদেহ রাখা হবে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশে। বাদ জোহর তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। এরপর তাঁর মরদেহ দাফন করা হবে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
‘আমায় ডেকো না’, ‘এই নীল মণিহার’, ‘আগে যদি জানতাম’ - এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী, বাংলা সঙ্গীতের বরপুত্র লাকী আখন্দ শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় আরমানিটোলার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।(ইন্না লিল্লাহি .... রাজেউন)। আধুনিক বাংলা গান তার হাতের স্পর্শে পেয়েছিল ভিন্নমাত্রা। তাঁর মৃত্যু সংবাদে দেশের সঙ্গীত অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। মৃত্যুকালে স্ত্রী মরিয়ম বেগম, মেয়ে মামিন্তি নূর আকন্দ ও ছেলে সভ্যতারা আখন্দকে রেখে গেছেন তিনি।
লাকী আখন্দের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ প্রমুখ।
আশা জাগিয়ে আড়াই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে গত সপ্তাহে বাসায় ফিরে এসেছিলেন শিল্পী। পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় তার বাসায় সবার মনে স্বস্তি। তবে গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর অবস্থা খারাপের দিকে গড়ায়। পারিবারিক সূত্র জানায়, বিকালের দিকে শরীর ঠান্ডা হয়ে আসতে থাকে তাঁর। এসময় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬১ বছর।
লাকী আখন্দের মরদেহ গতকাল রাতে বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। আজ শনিবার সকালে আরমানিটোলা জামে মসজিদ মাঠে তাঁর প্রথম প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। শিল্পীর মেয়ে মামিন্তি নূর আখন্দ জানান, বাবার জ্বর ছিল। কাল রাত থেকে তা বাড়ছিল। সেই জ্বর আর কমেনি। তবে সকালের দিকে একটু একটু কথা বলছিল। লাকী আখন্দের বোন জেসমিন আখন্দ বলেন, আমার ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সরকারের কাছে আবেদন তাঁকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
এদিকে লাকী আখন্দের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আরমানিটোলার বাসায় ছুটে আসেন শিল্পী ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, মানাম আহমেদ, আসিফ ইকবাল, গায়ক শাহেদ প্রমুখ। শিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, লাকী ভাই অনেক কালজয়ী গান গেয়েছেন, লিখেছেন, সুর করেছেন। তার গানগুলো যেন সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়। শিল্পী মানাম আহমেদ বলেন, লাকী ভাইয়ের যে গান রয়েছে তার পরিবার যেন কপিরাইট ঠিকভাবে পায় তা নিশ্চিত করাটা জরুরি। তার মতো শিল্পী যেন বঞ্চিত না হন সেটা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বরেণ্য এ শিল্পীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ারে ভর্তি করা হয়। তিনি সেখানে অধ্যাপক নেজামুদ্দিন আহমেদের অধীনে চিকিত্সাধীন ছিলেন। গেল সপ্তাহে শরীরের অবস্থা উন্নতি হলে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। লাকী আখন্দ ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। ২০১৫ সালে তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। গত বছর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ছয় মাসের চিকিত্সা শেষে ২৫ মার্চ দেশে ফেরেন তিনি। সেখানে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছিল তার। প্রসঙ্গত, শিল্পীর চিকিত্সায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলা গানের জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন শিল্পী লাকী আখন্দ। আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয় এ কণ্ঠশিল্পী একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার ও গীতিকার। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে প্রথমবারের মতো একক অ্যালবাম বের হয় তার। ওই অ্যালবামের ‘এই নীল মণিহার’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘রীতিনীতি জানি না’, ‘মামনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম’ গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ১৯৮৭ সালে ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের মৃত্যুর পরপর সঙ্গীতাঙ্গন থেকে অনেকটাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নেন এই গুণী শিল্পী। এরপর প্রায় এক দশকের নীরবতা ভেঙে ১৯৯৮-এ ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবাম দুটি নিয়ে আবারও শ্রোতাদের মাঝে ফিরে আসেন লাকী আখন্দ।
লাকী আখন্দের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন। কৈশোরেই সুযোগ পান এইচএমভি পাকিস্তানে। ১৪ বছর বয়সে সুরকার হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। এরপরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সঙ্গীতের এই বরপুত্রকে। সুরকার হিসেবে আরো কাজ করেছেন এইচএমভি ভারত এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পর পর নতুন উদ্যমে বাংলা গান নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার নিজের সুর করা গানের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। শিল্পীর সহোদর ক্ষণজন্মা হ্যাপী আখন্দের সাথে ছিল তার আত্মার সম্পর্ক। ভাইয়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। দুজনের যৌথ প্রয়াসে সূচিত হয়েছিল বাংলা গানের এক নতুন ধারা।
কুমার বিশ্বজিত্ এর কণ্ঠে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘কী করে বললে তুমি’, হাসানের ‘হূদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’- এর মতো অনেক জনপ্রিয় গানের সুরারোপ করেন তিনি।
ইত্তেফাক/রেজা