নামে আছে, কাজে নেই: হুমকিতে ইনানী জাতীয় উদ্যান

 
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটন স্পট উখিয়ার উপকূলীয় এলাকা সাগর পাহাড় প্রকৃতির নৈসর্গিক মেলবন্ধন ইনানীর ১০ হাজার হেক্টর বনভূমি নিয়ে গড়ে তোলা প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যান কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ১০ বছর ধরে। বন্যপশু প্রাণী, জীব বৈচিত্র্যের উন্নয়নসহ ইকো ট্যুরিজম স্পটের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও জাতীয় উদ্যানের স্বীকৃতি অজ্ঞাত কারণে লাল ফিতায় আটকে রয়েছে।
 
যে কারণে সম্ভাবনাময়ই আয়ের উৎস পর্যটন স্পটটি মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে বলে দাবী করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদী সচেতন মহল। ইনানী রক্ষিত বনাঞ্চল সহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, ইনানীর ১০ হাজার হেক্টর বনভূমিকে পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ দেশি বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মহান উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় উদ্যান হিসাবে সরকারি স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য ইতিপূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশ কয়েকবার আবেদন আকারে পরিপত্র প্রেরণ করা হলেও কার্যত কোন সুফল পাওয়া যায়নি।
 
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ মহি উদ্দিন প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যান পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করে এ বনটিকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে খুব সহসায় অনুমোদন দেওয়ার আশ্বস্ত করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
 
জালিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী জানান, ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইনানীর ১৯ হাজার হেক্টর বনভূমির ৮০শতাংশ বন সম্পদ উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে বন্য পশুপ্রাণী আবাস স্থল হারিয়ে লোকালয়ে চলে আসতে শুরু করে। বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বসতি স্থাপন ও কৃষি জমিতে রূপান্তর সহ নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি পাচার ও বন্যপশুপ্রাণী শিকার করার ফলে জীব বৈচিত্র্য বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। এখানে বন বিভাগ থাকলেও তাদের ভূমিকা রহস্যজনক। 
 
এ প্রসঙ্গে ইনানী বনরেঞ্জ কর্মকর্তা ইব্রাহিম হোসেন জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় জাতীয় উদ্যানের আওতাধীন বনভূমি দখল করে স্থাপনা তৈরির কথা স্বীকার করে বলেন, এসমস্ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ পাহাড় কেটে মাটি পাচার প্রতিরোধ করতে গেলে মুঠোফোনে হুমকি প্রদর্শন করা হয়। যে কারণে বনের ভিতর অনৈতিকতা বন্ধ করা বনকর্মীদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ২০০৯ সালে স্থানীয় বনবিভাগ, বেসরকারি এনজিও সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশন, স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা শেড যৌথ উদ্যোগে এলাকার বন নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে “বন বাঁচায় আমাদেরকে, আমরা বাচাঁবো বনকে” এ স্লোগানকে সামনে রেখে ইনানীর বন উন্নয়নে একটি বন রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়।
 
ইনানী রক্ষিত বনাঞ্চল সহায়ক কমিটির সমন্বয়কারী শাহদাত হোসেন জানান, ইনানী বন সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারি বন নির্ভরশীল প্রায় ২৪টি গ্রামভিত্তিক বন সংরক্ষণ ফোরাম গঠন করা হয়। তাদেরকে ৪০ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এককালীন সহায়তা প্রদান করে বিভিন্ন পেশায় সম্পৃক্ত করা হলে তারা বাঁশ, গাছ, পশু প্রাণী শিকার বন্ধ করে নিজেরাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। এতে বনের উপর চাপ কমে যায় বলে ওই কর্মকর্তা স্বীকার করে বলেন, ইনানীর ন্যাড়া বনে গাছ-গাছালি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বনায়নে রূপান্তর হয়েছে। যা জাতীয় উদ্যানে স্বীকৃতির উপযোগী।
 
মনখালী রক্ষিত বনাঞ্চল সহায়ক কমিটির সভাপতি নুরুল আবছার জানান, স্থানীয় বনবিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ইনানীর বন থেকে কাঠ পাচার অব্যাহত রয়েছে। পাহাড় কেটে মাটি পাচারের ফলে জাতীয় উদ্যান কর্মসূচী হুমকির মুখে পড়েছে। ইনানী রক্ষিত বনাঞ্চল সহায়ক কমিটির ফিল্ড সুপার ভাইজার আবু সরওয়ার জানান, ইনানীর বনকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে অনুমোদন দেওয়া হলে বন বিভাগের কর্তৃত্ব থাকে না। বছর বছর বন বাগান সৃজনের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়াও বন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনৈতিক ফায়দা থেকে বনকর্মীরা বঞ্চিত হবে। যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইনানীয় ১০ হাজার হেক্টর বনভূমিকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে অনুমোদন দিতে গড়িমসি করছে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর