নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের তিন বছর

নূর হোসেন কারাগারে থাকলেও এখনো সিদ্ধিরগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ সহযোগীদের হাতে

 
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের তিন বছর পূর্ণ হলো আজ। সাত খুনের প্রধান আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেন এখন কারাগারের কনডেম সেলে বন্দী থাকলেও বহাল তবিয়তে এখনো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে যাচ্ছে তার সহযোগীরা। গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার কয়েকজন সহযোগী কাউন্সিলর ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নূর হোসেনের ফেলে যাওয়া রাজত্ব নিয়ন্ত্রণ করছে তার সহযোগীরা।
 
সাত খুনের ঘটনার আগে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাতে ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি, প্রকাশ্য মাদক, জুয়া, নগ্ননৃত্য পরিচালনা করত নূর হোসেন, যেখান থেকে তোলা টাকার প্রায় ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন সংস্থাকে উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হতো প্রতি মাসে। সাত খুনের মামলায় আসামিদের জবানবন্দি ও চার্জশিটে উঠে আসে এ সব তথ্য। সাত খুনের আসামিরা কারাগারে থাকলেও যারা এ সব সেক্টর পরিচালনা করত তারা এখনো এলাকায় বহাল তবিয়তে তা চালিয়ে যাচ্ছে।
 
দণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ আসামির মধ্যে রয়েছে— নূর হোসেনের প্রধান বডিগার্ড মর্তুজা জামান চার্চিল, প্রধান ক্যাশিয়ার আলী মোহাম্মদ, ক্যাশিয়ার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আবুল বাশার, মাদক স্পট, জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য পরিচালনাকারী রহম আলী ও মিজানুর রহমান।
 
সাত খুনের ঘটনায় গ্রেফতার হলেও শেষ পর্যন্ত চার্জশিটভুক্ত না হওয়ায় ছাড়া পাওয়া নূর হোসেনের আরো ১০ জন সহযোগী হলো— তার বডিগার্ড মহিবুল্লাহ, তানভীর, ইয়াসিন, আলমগীর, গাড়িচালক সোনা মিয়া, জুয়েল আহম্মেদ, মিজান, আবদুর রহিম, আরিফুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম। এজাহারভুক্ত কিন্তু চার্জশিট থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলো— সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার।
 
নূর হোসেনের সহযোগীদের দখলে পদ-পদবি
 
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নূর হোসেনের বেশ কয়েকজন সহযোগী কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের আগে কারাবন্দী নূর হোসেনের নির্দেশে তার অনুসারীরা কয়েক জন প্রার্থীর পক্ষে ছিল সক্রিয়।
 
নূর হোসেনের শ্যালক নূরে আলম খান পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। গত বছর রাজধানীর মহাখালীতে নূর হোসেনের লাইসেন্স বাতিলকৃত পিস্তলসহ ধরা পড়ার পরও নূর আলম চিকিত্সাধীন অবস্থায় পালিয়ে যান। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ড (জামপুর ইউনিয়ন, নোয়াগাঁও ইউনিয়ন, কাঁচপুর ইউনিয়ন ও সাদিপুর ইউনিয়ন) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন।
 
২ নম্বর ওয়ার্ডে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ওই মামলায় অব্যাহতি পাওয়া আসামি ইকবাল হোসেনের কাছে হেরেছেন। ইকবাল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হলেও তাকে প্রত্যক্ষ সহায়তা করছেন একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হাজী ইয়াসিন। ইয়াসিন মামলার আসামি হলেও চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়। ২০১৪ সালে নজরুলের মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বিউটি। ওই সময়ে নূর হোসেনের অনেক সহযোগী ছিল পলাতক। তবে এবার তারা এলাকাতে বীরদর্পে থাকায় কাজ করেছেন বিউটির বিরুদ্ধে ও ইকবালের পক্ষে।
 
৩ নম্বর ওয়ার্ডে এবারো জিতেছেন নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল। সাত খুনের পর তিনি দীর্ঘ দিন পলাতক ছিলেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে এলাকায় ফিরে এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নূর হোসেনের ক্যাশিয়ার আরিফুল হক হাসান এবারো জিতেছেন। গত বছরের ২৮ এপ্রিল মদসহ আরিফুলকে র্যাব গ্রেফতারও করেছিল। আরিফুল নির্বাচিত হওয়ার পর দিন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
 
৬ নম্বর ওয়ার্ডে থানা যুবলীগের আহ্বায়ক মতিউর রহমান জিতেছেন। সাত খুনের পর তিনি অনেক দিন পলাতক ছিলেন। ওই সময়ে সিআইডি কয়েকবার মতির বাসায় অভিযান চালায়। নূর হোসেনের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।
 
সাত খুনের ঘটনায় নজরুলের সাথে নিহত স্বপনের ভাই মিজানুর রহমান খান রিপন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচন করে হেরেছেন। এখানে জিতেছেন নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজন আলী হোসেন আলা।
 
এখানো এলাকাতে নূর হোসেনের লোকজন
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নূর হোসেনের ভাই নুরুজ্জামান জজ এলাকায় ফিরেই কাঁচপুর সেতুর ঢালে মেসার্স জেরিন ট্রেডার্সের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বালুর ব্যবসায় শুরু করেছেন। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালটির নিয়ন্ত্রণ ছিল নজরুল ও জহিরুলের হাতে। কাউন্সিলর আরিফুল ও কাউন্সিলর বাদল এখন ট্রাকস্ট্যান্ডটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। নূর হোসেনের ভাতিজা আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু এলাকায় ফিরে লেগুনা ও টেম্পোস্ট্যান্ড দখলে নিয়েছেন। সেখানে ৩০০ লেগুনা থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। নূর হোসেনের ভগ্নিপতি রতন মোল্লা পরিবহন সেক্টরের দখল নিয়েছেন।
 
সব মিলিয়ে নূর হোসেনের সহযোগীদের দাপটে এখনো কোণঠাসা সাত খুনে নিহতদের স্বজনসহ এলাকাবাসী। আতঙ্ক কাটছে না কোনোভাবেই। সাত খুনের মামলার বাদী ও নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অভিযোগ করেন, মামলার কারণে এবার হাজী ইয়াছিন তার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। সে কারণেই নির্বাচনে তিনি হেরে গেছেন। এখন তাদের উল্টো হুমকি দেয়া হয়েছে। সাত খুনের চার্জশিট দেয়ার পর থেকে অব্যাহতি পাওয়া লোকজন এসে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে।
 
এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরাফত উল্লাহ জানান, কেউ কাউকে হুমকি দিচ্ছে কিংবা স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেননি।
 
ইত্তেফাক/কেকে