ব্যারিস্টার তমিজ উদ্দিন
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমাদের দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে অবিভক্ত পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি মরহুম বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদের ঐতিহাসিক বিচারিক অনেক রায় ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে আইনের জগতে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। মানুষের মৌলিক অধিকার, সুশাসন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদের বিচারিক রায়গুলো তথাকথিত বেসিক ডেমোক্রেসির লেবাসে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকারের শরীরের মাংসপিণ্ডে এক একটি কাঁটা হয়ে ওঠে। তাঁর সাহসী বিচারিক রায় বিচারপতি মোর্শেদকে কেবল জাতীয়তাবোধই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা, খ্যাতি অর্জন ও আলোচনার কেন্দ্রতে নিয়ে যায়।
পেশাগত জীবনে তাঁর কঠোর পরিশ্রম, অসামান্য মেধা এবং জ্ঞান অর্জনের অফুরন্ত ক্ষুধা তাঁকে নিয়ে গিয়েছে খ্যাতির শীর্ষ অবস্থানে। ১৯৫৪ সালের শেষের দিকে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে যোগ দেন এবং একই বছর ঢাকা হাইকোর্টের বিচারক পদে নিযুক্ত হন। বিচারপতি মোর্শেদ পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৪ সালে তিনি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিম্ন আদালতের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এবং তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিচারপতির দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কিছু ঐতিহাসিক রায় এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যা উপমহাদেশের পরিধি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব খান তার সামরিক শাসন পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা দায়ের করে সে সময়ে বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে জনতার কাতারে এসে দাঁড়ান। বিচারপতি মোর্শেদ গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকারে বিশ্বাস করতেন এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মারফত গণতন্ত্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছেন এবং সফলতাও অর্জন করেছেন।
প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর প্রথমেই তিনি মনোযোগ দেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের পক্ষে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণের এবং পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গঠন করেন। এ জনমত গঠন করার মাধ্যমেই মাহবুব মোর্শেদ রাজনীতিতে সরাসরি পদার্পণ করেন। তিনি সামনে থেকে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক ‘আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন’ (Anti-Ayub Movement) গড়ে তোলেন। সে সময়ের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে ও তাদের মুক্তির জন্য সভা, সমাবেশ, সেমিনার এবং আন্তর্জাতিক মহলে আবেদন জানান। তাঁর এ অবদানের কথা ইতিহাসের পাতা থেকে কখনও মুছা যাবে না। তাঁর মত গুণীর জন্ম বার বার হবে কি-না এ প্রশ্নের উত্তর না জানলেও তিনি আমাদের মাঝে আছেন জীবন্ত ইতিহাস হয়ে, তা জানি।