ভারতের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারক তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসাবে সেই দেশের প্রধান বিচারপতিসহ সর্বোচ্চ আদালতের সাত বিচারকের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয় সাত বিচারকের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষারও দিয়েছেন নির্দেশ। আর এ ঘটনা ঘটিয়েছেন গতকাল বুধবার নিজের বাড়িতেই আদালত বসিয়ে। এর আগে আদালত অবমাননার এক মামলায় ওই বিচারপতিকে তলব করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। একইসঙ্গে আদালতে হাজিরের পূর্বে তার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনা নিয়ে বিচারাঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বিচারপতির ‘এই কাণ্ড’ কে বিদ্রোহ হিসাবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট এরকম নির্দেশ দিয়ে বিষয়টিকে জটিল করে ফেলেছে।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিন্নাস্বামী স্বামীনাথন কারনান গত ২৩ জানুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে ভারতের ২০জন বিচারক ও ৩ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উত্থাপন করে তাদের শাস্তি দাবি করেন। তবে এর স্বপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ তিনি দেননি। এটি প্রকাশিত হলে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করে। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হবে না ১৩ ফেব্রুয়ারি সশরীরে উপস্থিত হয়ে তার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি কারনান আদালতের ওই নির্দেশনা মান্য করেননি। তিনি আদালতে হাজির না হলে সুপ্রিম কোর্ট ১০ মার্চ পুনরায় হাজিরের জন্য নির্দেশ দেয়। বিচারপতি কারনান সেই নির্দেশও অমান্য করেন। ওইদিনই সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে সমন জারি করে এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে ৩১ মার্চ আদালতে হাজির করার জন্য। একইসঙ্গে তার বিচারিক ও দাপ্তরিক ক্ষমতা অনির্দিষ্টকালের জন্য কেড়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর সংকটের নতুন মাত্রা লাভ করে। বিচারপতি কারনান সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দলিত সম্প্রদায়ের বলেই উচ্চ বর্ণের বিচারপতিরা তাকে হেনস্থা করছেন। তিনি সাত বিচারকের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্য ও ক্ষতিপূরণ মামলা নিবন্ধনের নির্দেশ দেন এবং ১৪ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। এদিকে দিল্লী থেকে সুপ্রিম কোর্টের সমন এবং পরোয়ানা পশ্চিমবঙ্গে এসে পৌঁছলে সেখানকার পুলিশ বিচারপতি কারনানকে আদালতে হাজিরের নির্দেশনা তামিল করতে তার বাসভবনে যায়। পুলিশ পরোয়ানা নিয়ে হাজির হলে বিচারপতি কারনান সুপ্রিম কোর্টের এই পরোয়ানাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। যদিও এ সময় তার কোনো ধরনের বিচারিক এখতিয়ার ছিল না। এই পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার নিজ বাসভবনে আদালত বসান বিচারপতি কারনান। আদালত বসিয়ে তিনি ভারতের প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারকের দেশ ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ভারতের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপর তার তথাকথিত নির্দেশে বলা হয়, যেহেতু সাত বিচারকের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্যের মামলা রয়েছে সেহেতু আপাতত তাদের দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে সাত বিচারককে ১ মে নিজের বাড়ির এজলাশে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনা গণমাধ্যমে ুপ্রকাশিত হওয়ার পর গত সোমবার প্রধান বিচারপতি জেএস থেহার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারকের বেঞ্চ বিচারপতি কারনানের মানসিক সুস্থতা পরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেন। পশ্চিমবঙ্গের পুলিশকে বিচারপতি কারনানের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ৮ মের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এ সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়, বিচারপতি কারনান যেভাবে সর্বোচ্চ আদালতের সাত বিচারককে কলকাতায় তলব করেছেন এবং তার বক্তব্য যেভাবে গণমাধ্যমে এসেছে তাতে এই আদালতের এই বিশ্বাস জন্মেছে তিনি হয়তো আদালত অবমাননার মামলায় নিজের পক্ষে সঠিকভাবে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন না। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তার মানসিক সুস্থতার প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলো। সুপ্রিম কোর্টের ওই আদেশকে দলিত সম্প্রদায়ের একজন বিচারকের প্রতি অপমান হিসেবে বর্ণনা করেন বিচারপতি কারনান। তিনি এই আদেশকে অন্যায় এবং বেআইনি অভিহিত করে কোনো ধরনের মেডিক্যাল পরীক্ষা করতে যাবেন না বলে জানিয়ে দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শারীরিক এবং মানসিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং এই সুস্থতা সম্পর্কে তার স্ত্রী ও দুই ছেলে পুরোপুরি সন্তুষ্ট। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আরেকটি আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে দিল্লি পুলিশের মহাপরিচালককে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন এবং ওই বোর্ডে সাত বিচারকের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ৭ মের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। গত বুধবার বিচারপতি কারনান সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতি তার আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। এ সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়, জনস্বার্থে দুর্নীতি ও অস্থিরতা থেকে দেশকে রক্ষার স্বার্থেই বিচারপতি কারনান স্বপ্রণোদিত হয়ে এই নির্দেশ দিয়েছে। এই ঘটনা ভারতের বিচারাঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে তা দেখতে ৮ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কেননা সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল ওইদিন বিচারপতি কারনানকে সুপ্রিম কোর্টে হাজিরের জন্য। সর্বোচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা মান্য করতে কলকাতার পুলিশ আইন ও সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। অন্যদিকে আইনজীবীরা মনে করছেন, পুলিশ দিয়ে বিচারপতি কারনানকে আদালতে হাজির করা সহজসাধ্য হবে না। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এরকম ঘটনা আগে হয়নি। তবে আমার মনে হয়, সুপ্রিম কোর্ট বোধহয় একটু ভুল করে ফেলছে। বিচারপতি কারনানের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকত, তাহলে তাদের নিজস্ব বিবাদ মেটানোর যে ব্যবস্থাপনা আছে, তা দিয়েই করা যেত। আদালত অবমাননার মামলা হলো কেন? তিনি বলেন, বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত করে সেই প্রতিবেদন যদি প্রকাশ করা হতো, তাতে যদি দেখা যেত যে বিচারপতি কারনানের অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাহলেই পরিস্থিতি আর এতটা ঘোলা হতো না।
বিচারপতি কারনানের আইনজীবী পিটার রমেশ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার যে মামলা চলছে, সেখানে মেডিক্যাল পরীক্ষার মতো আদেশ দেওয়ার সুযোগ নেই। ওই পরীক্ষা করাতে হলে ২০১৭ সালের মানসিক ব্যাধি আইনে তা করতে হবে। বিচারপতি কারনান মনে করছেন, সর্বোচ্চ আদালতের যে মাননীয় বিচারকরা এই নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরই পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে- কারণ তারা বিচারপতি কারনানের মতো একজন সুস্থ মস্তিষ্কের বিচারকের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই টানাপড়েন চলতে পারে অন্তত আগামী ১২ জুন পর্যন্ত। ওইদিন বিচারপতি কারনানের বয়স ৬২ বছর হবে এবং তিনি অবসরে যাবেন। আইন অনুযায়ী, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সুপ্রিম কোর্টের জন্যও সহজ হবে। সংবিধান ও প্রথাগত আদালতের বিরুদ্ধে বিচারপতি কারনানের এই অবস্থান বিচারিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ইত্তেফাক/নূহু