খাগড়াছড়ি জেলার লাগোয়া ফটিকছড়ির সাতটি চা বাগান দীর্ঘদিন পাহাড়ি তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে জিম্মি। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আঞ্চলিক সংগঠনের এই সন্ত্রাসীদের নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলে চা বাগানের কার্যক্রম বন্ধ থাকে। সন্ত্রাসীরা চা বাগান কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে, এই এলাকায় চা বাগান চালাতে হলে তাদেরকে চাঁদা দিতেই হবে। বছরে সাতটি চা বাগান থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তিনটি গ্রুপকে দিতে হয় বলে শ্রমিক-কর্মকর্তারা জানান।
তারা জানান, চাঁদা দিয়ে চা বাগান চলে এবং শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জীবন রক্ষা হয়। তবে এখানেই শেষ নয়। আবার নানা উত্সবের নামে সন্ত্রাসীরা সাতটি চা বাগান থেকে চাঁদাবাজি করে। চাঁদা দিতে বিলম্ব হওয়ায় গত বছর কর্ণফুলী চা বাগানের দুজন কর্মকর্তার উপর হামলাসহ বাগানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। ভয়ে অস্ত্রধারী ঐসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
স্থানীয় প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ। ওই এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প তুলে নেওয়ার পর থেকে পাহাড়ি তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে সাতটি চা বাগান জিম্মি হয়ে পড়ে। শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দিন কাটে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। অর্ধ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারি—কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দা ওই তিনটি সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড়, মানিকছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি সীমানা ঘেঁষে ফটিকছড়ির দাঁতমারা, নিউ দাঁতমারা, নাছেহা, আছিয়া, নেপচুন, ডলু কৈয়াছড়া ও কর্ণফুলী চা বাগান অবস্থিত। দুর্গম ও গভীর বনাঞ্চল ঘেরা পার্বত্য এলাকা লাগোয়া হওয়ায় চা বাগানগুলোর উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায় পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনগুলো এসব বাগান থেকে নিয়মিত মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে থাকে।
একটি বাগানের এক ব্যবস্থাপক জানান, বাগানের আয়তন ও অবস্থা ভেদে তারা চাঁদার হার ধার্য্য করে দেয়। বছরের প্রথম দিকেই চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে হয়। চাঁদা দিয়ে টোকেন নিতে হয়। ঐ ব্যবস্থাপক আরও বলেন, নির্দিষ্ট করা চাঁদার বাইরে পার্টির বিশেষ কোন প্রোগ্রাম উপলক্ষেও চাঁদা আদায় করা হয় বাগানগুলো থেকে। চাঁদা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ইতিপূর্বে নেপচুন বাগানের এক কর্মকর্তাও অপহূত হয়েছিলেন ঐ সংগঠনের সন্ত্রাসীদের হাতে।
পাবর্ত্য এলাকা লাগোয়া বাগানের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যেই টহল দেয়। তাদের নিয়োগ করা কালেক্টর চাঁদার টাকা আদয় করে। সংগঠনের এরিয়া কমান্ডার সব কিছু মনিটরিং করে। দুর্গম ও জনশূণ্য হওয়ায় এলাকাগুলো তাদের কাছে অনেকটা মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। জানাযায়, অন্য বাগানগুলোর মত কর্ণফুলী চা বাগান কর্তৃপক্ষও পাহাড়ি সংগঠনগুলোকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে থাকেন। ঐ এলাকাটি ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সংস্কার) এর নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাত্সরিক চাঁদা তারাই আদায় করে। লক্ষ্মীছড়ির সীমানা লাগোয়া কর্ণফুলী চা বাগানের বিশাল এলাকা তারা জোরপূর্বক দখল করে। সেখানে কিছু নীরিহ উপজাতি পরিবারকে ঘর বানিয়ে বসিয়েছে। বাগানের শ্রমিক-কর্মচারি-কর্মকর্তারা জানান, সেখানে কমপক্ষে ৫শ একর জমি তারা বেদখল করেছে। এরমধ্যে জাফরাবাদ, দুইদ্যেখোলা, ট্যোক বাড়িয়া, সরকারী ডেবা, রক্তছড়ি, মানিকপুর এলাকা রয়েছে। সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া এ জায়গাগুলোর ভূমি কর পরিশোধ করলেও সন্ত্রাসীদের বাধার মুখে সেখানে চা আবাদ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান মমতাজুল হাসান মন্টু পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায় সম্পর্কে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘেঁষা বাগানগুলো নিয়মিতই তাদের চাঁদা দিতে হয়। তবে কে কত টাকা চাঁদা দেয় কেউ ভয়ে তা প্রকাশ করেন না। তিনি বলেন, সমতল জেলা হলেও ভৌগলিক কারণে বাগানগুলোর কর্তৃপক্ষ পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হাতে জিন্মি। নেপচুন চা বাগানের ডিজিএম কাজী এরফান উল্ল্যাহ বলেন, ফটিকছড়ি সীমান্তে খাগড়াছড়ির রামগড়ের গৈয়াপাড়া এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পটি তুলে নেওয়ার পর পুরো এলাকা ঐ সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তিনি তুলে নেওয়া সেনা ক্যাম্পটি পুনরায় স্থাপনের দাবি জানান। ফটিকছড়ির হালদা ভ্যালি ও রামগড় চা বাগানের সিনিয়র ব্যবস্থাপক ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, খাগড়াছড়ির সীমানায় অবস্থিত ৭টি চা বাগান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজিসহ নানা নিপীড়নের শিকার।
অভিযোগ উঠেছে নারী শ্রমিকদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের আস্তানায় আটক রেখে পালাক্রমে যৌন নির্যাতন চালায়। বাগানগুলোর কর্তৃপক্ষ সরকারকে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ও ভূমি কর দিচ্ছে। বর্তমান সরকার চা শিল্প ও শ্রমিকদের উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে। এ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফটিকছড়ির বাগানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম বলেন, শুধু চা বাগান নয়, অন্যান্য ফসলী জমিতে চাষাবাদের , পোল্ট্রি খামার, কাঠ, বাঁশের ব্যবসা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সবকিছুতেই চাঁদার ভাগ বসায় তারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে এ সমতল জেলায়ও সন্ত্রাসীরা অরাজকতা করছে। চা বাগানগুলো থেকে মোটা অংকের চাঁদা নিচ্ছে। ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া তো দূরে থাক, কথা বলতেও সাহস পায় না। স্থানীয় প্রশাসন নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে। কোন কোন প্রশাসনকে সন্ত্রাসীরা ‘মামু’ বলে ডাকে। কেননা প্রশাসনের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সখ্যতা রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে।